প্রথমে ধাঁধা দিয়েই শুরু করি! ৭ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকা অংকে লিখুন, সঠিক হলে আপনাকে অভিনন্দন! আমার মতো বেঠিক হলে নিচের লেখা আপনার জন্যই।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক তথ্যে ‘কমা’ বা ‘দশমিকের’ অবস্থান এবং ‘মিলিয়ন-বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন’ বনাম ‘লক্ষ-কোটি’র গোলকধাঁধায় প্রকৃত চিত্র আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। তথ্যগত অসংগতির কারণে জিডিপি, রিজার্ভ ও রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের গরমিল দেখা দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ইপিবির রপ্তানি তথ্যে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান এবং জিডিপি আকারে প্রায় ১০,০০০ কোটি ডলারের অতিরঞ্জনের আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া আইএমএফ-এর বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ গণনায় বিভ্রান্তি এবং ব্যাংকিং খাতে ১.৫৫ ট্রিলিয়ন টাকার মূলধন ঘাটতি অর্থনীতির প্রকৃত সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বৈশ্বিক ও স্থানীয় গণনা পদ্ধতির এই সমন্বয়হীনতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করছে। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া সরকারি নীতি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং আমদানিসহ ডলার সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। এগুলি প্রমাণ করে যে, সংখ্যা পদ্ধতির বিভ্রান্তি কেবল গাণিতিক ভুল নয়, বরং এটি একটি জাতীয় নীতিনির্ধারণী ঝুঁকি।
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন দেখছে, তখন একটি মৌলিক কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের অগোচরে রয়ে যাচ্ছে তা হলো গণিতে আমাদের সংখ্যা গণনা ও প্রকাশের পদ্ধতি। আমরা এখনো ‘লক্ষ-কোটি’র গোলকধাঁধায় আটকে আছি (যা তিন-দুই-দুই ঘর পরপর কমা এবং বড় সংখ্যার ক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম জটিল পদ্ধতি) যেখানে সারা বিশ্ব ‘মিলিয়ন-বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন’ বা তিন-ঘর পরপর কমা দেওয়ার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড গ্রহণ করেছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবল একটি গাণিতিক প্রকাশভঙ্গি মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে আমাদের অর্থনৈতিক মনস্তত্ত্ব এবং বিশ্ববাজারের সাথে তাল মেলাতে না পারার জড়তা। একটি কমা আগে বা পরে দেওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে উন্নয়নের নতুন ভাষা!
দেশীয় পদ্ধতিতে বড় সংখ্যা গণনার সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর দিকটি হলো ‘কোটি’-র উপরের হিসাব। আমাদের প্রচলিত নিয়মে প্রথম কমা ৩ ঘর পর এবং পরেরগুলো ২ ঘর পর বসার কথা থাকলেও, সংখ্যা যখন হাজার কোটি ছাড়িয়ে যায়, তখন আমরা আবারও ৩ ঘর পর কমা দিতে বাধ্য হই। যেমন ১০,০০০ কোটি টাকা। এখানে লক্ষ্য করুন, অংকে লিখলে এটি হয় ১,০০,০০,০০,০০,০০০। কিন্তু আমরা যখন একে ‘১০,০০০ কোটি’ হিসেবে প্রকাশ করি, তখন কোটির ঘরের বাম পাশে আবারও ৩ ঘর পর কমা বসাই। অর্থাৎ, ১০ হাজার কোটি লিখতে গিয়ে আমরা মূলত চিরাচরিত ২-ঘর নিয়ম ভেঙে ৩-ঘর ব্যবহার বা আন্তর্জাতিক পদ্ধতির অনুকরণ করছি, অথচ আমাদের এককটি রয়ে গেছে দেশীয় (কোটি)। এই মিশ্র পদ্ধতি বা ‘হাইব্রিড কমা’ বিন্যাসই প্রমাণ করে যে, দেশীয় পদ্ধতিটি বিশাল অংকের সংখ্যা ধারণে গাণিতিকভাবে অসম্পূর্ণ; গণিতের তত্ত্বে এটি একটি বড় ভুল। এই যে পদ্ধতির ভেতরেই পদ্ধতি পরিবর্তনের আবশ্যকতা, এটিই আমাদের সিগন্যাল দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক ৩-ঘর পদ্ধতির মহাসড়কে ওঠার সময় এখনই।
সংখ্যা পদ্ধতির বিবর্তন: আদম থেকে আধুনিক যুগ: সংখ্যা পদ্ধতির ইতিহাস মূলত মানবসভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাস। মানবজাতির ঊষালগ্নে, হযরত আদম (আ.)-এর সময় থেকেই গণনার প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল। আদি মানুষ আঙুল দিয়ে গুনত বলেই আজ আমাদের সংখ্যা পদ্ধতি ১০-ভিত্তিক। তবে ১ থেকে ৯ এবং শূন্যের (০) এই বৈপ্লবিক উদ্ভাবন ঘটেছিল প্রাচীন ভারতে। দার্শনিক ‘শূন্যতা’ বা নির্বাণের ধারণা থেকেই শূন্যের জন্ম। কিন্তু একে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার এবং গাণিতিক ভিত্তি দেওয়ার কৃতিত্ব মধ্যযুগের মুসলিম গণিতবিদদের। আল-খোয়ারিজমির ‘আল-জাবর’ ছাড়া আজকের আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞান কল্পনাও করা যেত না। পশ্চিমা সভ্যতা বা ইউরোপ ও আমেরিকা আজ যে উন্নয়ন ভোগ করছে, তার মূলে রয়েছে মুসলিমদের হাত ধরে পৌঁছানো এই ‘হিন্দু-অ্যারাবিক’ সংখ্যা পদ্ধতি।
ঐতিহাসিক শিক্ষা: কেন আমরা পিছিয়ে?: প্রাচীন গ্রিকরা জ্যামিতিতে শ্রেষ্ঠ হলেও তাদের সংখ্যা পদ্ধতি ছিল বর্ণমালা-নির্ভর। বড় সংখ্যা গণনার জন্য তাদের কাছে ‘মিরিয়াড’ (দশ হাজার)-এর বেশি কোনো সহজ একক ছিল না। গণিতবিদ আর্কিমিডিস তাঁর ‘দ্য স্যান্ড রেকনার’ গ্রন্থে এই সীমাবদ্ধতা ভাঙার চেষ্টা করলেও সাধারণের জন্য তা ছিল দুর্বোধ্য। অন্যদিকে, রোমানদের পদ্ধতিতে ‘শূন্য’ না থাকায় বড় সংখ্যার গুণ-ভাগ করা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। ইউরোপ যখন বুঝতে পারল যে রোমান পদ্ধতি দিয়ে বিশ্ববাণিজ্য সম্ভব নয়, তখন তারা রক্ষণশীলতা ভেঙে মুসলিম গণিতবিদদের মাধ্যমে ভারতীয় ‘হিন্দু-অ্যারাবিক’ পদ্ধতি গ্রহণ করে।
মায়া সভ্যতা বিশ-ভিত্তিক পদ্ধতিতে শূন্যের ব্যবহার করে পঞ্জিকা তৈরি করেছিল, আর চীনারা উদ্ভাবন করেছিল ৪-ঘর ভিত্তিক শক্তিশালী গণনা পদ্ধতি। ১৯৪৮ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল সিস্টেম অফ ইউনিটস’ (ঝও) আসার পর বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক প্রয়োজনে বিশ্বব্যাপী তিন-ঘরের গ্রুপিং (১০^৩, ১০^৬, ১০^৯) বাধ্যতামূলক করা হয়। আমাদের ‘লক্ষ-কোটি’ পদ্ধতি ১০০-এর ঘাতে (ঈবহঃবংরসধষ ংপধষব) জোড়ায় জোড়ায় সাজানো, যা বিশাল অংকের গাণিতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন একটি ‘প্রযুক্তিগত বাধা’ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবর্তন কেন প্রয়োজন?:
ক. ডিজিটাল বৈষম্য নিরসন: বিশ্বের প্রায় সমস্ত প্রোগ্রামিং ভাষা এবং ফিন্যান্সিয়াল সফটওয়্যার ডিফল্টভাবে তিন-ঘর পদ্ধতি অনুসরণ করে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা বিগ ডেটার দুনিয়া এভাবেই গড়ে উঠছে। আমাদের দুই-ঘর পদ্ধতির জন্য এই সফটওয়্যারগুলোতে আলাদা কাস্টমাইজেশন করতে হয়, যা ডেটা প্রসেসিংয়ে ভুলের ঝুঁকি বাড়ায়। আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে ১ এর পর ১০টি শূন্য থাকলে তা সরাসরি ১০ বিলিয়ন (১০,০০০,০০০,০০০) হিসেবে চেনা যায়, যেখানে কমার বিন্যাস শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুষম। কিন্তু দেশীয় অসংলগ্ন কমা পদ্ধতি সফটওয়্যার কোডিংয়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
খ. গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল মিস-কমিউনিকেশন দূরীকরণ: আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের বৈদেশিক ঋণের হিসাব বা রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ‘মেন্টাল কনভারশন’ করতে হয়। ১০ বিলিয়ন মানে ১০০০ কোটি, এই রূপান্তর করতে গিয়ে যে সময় অপচয় হয়, তা হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ট্রেডিং বা বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব ঘটায়। এই গাণিতিক অসঙ্গতিই প্রমাণ করে যে, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির ভার সইবার ক্ষমতা আমাদের প্রাচীন ‘লক্ষ-কোটি’ পদ্ধতির নেই।
গ. জনমানসের মনস্তত্ত্ব ও প্রশাসনিক জটিলতা উত্তরণ: বাংলাদেশের মানুষের কাছে ‘দশ লাখ’ যতটা পরিচিত, ‘এক মিলিয়ন’ ততটাই বিদেশি ও দুর্বোধ্য। আমাদের ভূমি রেজিস্ট্রি থেকে শুরু করে বাজেটের হিসাব, সবই এই কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। তবে ইতিহাস বলে, যে জাতি তাদের সংখ্যা পদ্ধতিকে আধুনিকায়ন করতে পারেনি (যেমন গ্রিক বা রোমানরা), তারা বৈশ্বিক অগ্রযাত্রায় স্থবির হয়ে হারিয়ে গেছে।
উত্তরণের রোডম্যাপ: ৫-দফা প্রস্তাবনা
ক. ডুয়াল রিপোর্টিং: আগামী অর্থবছর থেকে জাতীয় বাজেটে ‘লক্ষ-কোটি’র পাশাপাশি ব্র্যাকেটে আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে মিলিয়ন-বিলিয়ন এবং তিন-ঘর পরপর কমা দিয়ে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা হোক। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ছিল ৭,৯০,০০০,০০,০০,০০০ টাকা (সাত লক্ষ নব্বই হাজার কোটি টাকা)। আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে এই সংখ্যাটি হলো ৭,৯০০,০০০,০০০,০০০ (৭.৯ ট্রিলিয়ন টাকা)। মার্কিন ডলারে কনভার্ট করলে এটি প্রায় ৬৪.২৬ বিলিয়ন ডলার। এই মানদণ্ড অনুসরণ করলে উন্নয়ন অংশীজন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আমাদের বাজেটের গুরুত্ব সহজে স্পষ্ট হবে।
খ. শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন: প্রাথমিক স্তর থেকেই দেশীয় পদ্ধতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পদ্ধতির তুলনামূলক প্রয়োগ শেখানো। বড় সংখ্যা লেখার ক্ষেত্রে একটি কমার অবস্থানের কারণে কী ধরণের বড় পরিবর্তন হয়, তা শিক্ষার্থীদের ব্যাখ্যা করা।
গ. ডিজিটাল রিফর্ম: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সমস্ত ব্যাংকিং অ্যাপে ব্যবহারকারী চাইলে যেন তার পছন্দমতো লক্ষ/কোটি বা মিলিয়ন/বিলিয়ন ভিউ পরিবর্তন করে দেখতে পারেন। সকল সরকারি ওয়েবসাইটে ‘কনভার্টার অপশন’ চালু করা।
ঘ. আইনি পরিভাষা সংস্কার: বিদ্যমান আইনগুলোর গাণিতিক পরিভাষায় লক্ষ-কোটির পাশাপাশি মিলিয়ন ও বিলিয়ন শব্দ অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করা। এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা!
ঙ. জনসচেতনতা: সরকারি তথ্য বাতায়ন ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে ‘১০ লাখ মানেই ১ মিলিয়ন’ এরকম সহজবোধ্য প্রচারণা চালানো। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত করা।
“জগাখিচুড়ি” কমা পদ্ধতিই আমাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছনে ফেলছে। একটি কমা হতে পারে একটি জাতির ভাগ্য উন্নয়নে সহায়ক। সংখ্যা কেবল গণনার মাধ্যম নয়, এটি যোগাযোগের আন্তর্জাতিক ভাষা। টাকা বা ডলার যে কারেন্সিই হোক, আন্তর্জাতিক বাজারে রূপান্তরের সময় আমাদের যে ‘মেন্টাল ল্যাগ’ তৈরি হয়, তা কাজের গতি কমিয়ে দেয়। লক্ষ-কোটি আমাদের ঐতিহ্য, একে আমরা হৃদয়ে ধারণ করতে পারি; কিন্তু যখন বিশ্বের সাথে আমরা প্রতিযোগিতায় নামব, তখন আমাদের হাতিয়ার হতে হবে আধুনিক ও সর্বজনীন। আমরা কেবল অবকাঠামো নয়, আমাদের গাণিতিক মনস্তত্ত্বকেও আগামীর বাংলাদেশের জন্য উপযোগী করা আবশ্যক।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও পাবলিক পলিসি অ্যানালিস্ট।
আপনার মতামত লিখুন : :