• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Bancharampur Barta
Bongosoft Ltd.
নিরসনে টেকসই নীতিমালা প্রয়োজন

বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার বনাম ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পেশাগত বৈষম্য


বাঞ্ছারামপুর বার্তা | অ্যাডভোকেট মীর হালিম মে ২৬, ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার বনাম ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পেশাগত বৈষম্য

বাংলাদেশে পেশাগত আভিজাত্য বনাম প্রান্তিক লড়াইয়ের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হল বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার বনাম ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বান্দ্বিক অবস্থান। আমাদের দেশে প্রকৌশল শিক্ষার দুইটি ধারা যথা বিএসসি ও ডিপ্লোমার মধ্যে বিদ্যমান পেশাগত বৈষম্য ও পদোন্নতি সংকটে দীর্ঘকাল নানা রকম প্রতিবাদ হয়েছে, সর্বশেষ, ২০২৫ সালে সারাদেশে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়। মূলত সরকারি নীতিমালার অসংগতি ও স্বীকৃতির অভাবই এই উত্তেজনার মূল উপাদান।
বাংলাদেশের সামাজিক ও কারিগরি অঙ্গনে ডিপ্লোমা এবং বিএসসি (স্নাতক) প্রকৌশলীদের মধ্যকার সম্পর্ক আজ কেবল পেশাগত পার্থক্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও সামাজিক শীতলতায় রূপ নিয়েছে। এই ব্যবধানের পরতে পরতে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এক প্রচ্ছন্ন শ্রেণী বৈষম্য যেন কার্ল মার্কসের ইশতেহার! সমাজবিজ্ঞানের চিরন্তন দ্বান্দ্বিকতায় যেমন ধনী বনাম গরীব, অভিজাত বনাম সাধারণ, ব্রাহ্মণ বনাম ক্ষত্রিয়, কিংবা বুর্জোয়া বনাম প্রলেতারিয়েত লড়াই বিদ্যমান, ঠিক তেমনি এক অঘোষিত ‘এলিট’ বনাম ‘মিডল ক্লাস’ দ্বন্দ্বে ডিপ্লোমা ইন্জিনিয়ারগণ আজ যেন এ রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।
এই পতন কিছুটা পদ্ধতিগত ত্রুটি আর কিছুটা ইচ্ছাকৃত অবহেলার ফসল। কবির ভাষায়, ‘দিয়াছে যে-সব আকাশ-প্রদীপ জ্বালি, তাহারা মরিছে নিভি’। ঠিক তেমনি, জাতীয় উন্নয়নের বাতিঘর হয়েও ডিপ্লোমা ইন্জিনিয়ারগণ আজ আড়ালে পড়ে আছেন। বছরের পর বছর জমানো এই অবমাননা আজ ‘দিনে দিনে বাড়িয়াছে বহু দেনার’ মতো এক পাহাড়সম ক্ষোভে পরিণত হয়েছে, অসন্তোষ ছড়িয়ে পরেছে। রাজপথে সভা, সমাবেশ ও আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। কবি নজরুলের ভাষায় যেন ‘ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান, ইহাদের পথে, নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার’। এটি আজ কেবল পদমর্যাদার দাবি নয়, বরং এক অস্তিত্বের লড়াই, নিজস্ব আত্মমর্যাদা ও মানবিক ইজ্জত প্রতিষ্ঠার লড়াই। তাঁরা আজ কেবল বেতন স্কেলের পরিবর্তন চান না, বরং এই স্থবির সামাজিক ও পেশাগত স্তর বা শ্রেণী বিন্যাসের আমূল পরিবর্তন চান। জনগুরুত্বপূর্ণ এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে বৈষম্যের কারণগুলো বিশ্লেষণ করে একটি ন্যায্য ও টেকসই নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করাই আজকের লেখার উদ্দেশ্য।
১. সংকটের প্রধান কারণ
বাংলাদেশে ডিপ্লোমা এবং বিএসসি (স্নাতক) প্রকৌশলীদের মধ্যে পেশাগত দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে ১ম শ্রেণীর চাকরিতে প্রবেশাধিকার, পদমর্যাদা, পদোন্নতি কোটা এবং ‘ইঞ্জিনিয়ার (প্রকৌশলী)’ উপাধি ব্যবহারের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। বর্তমান পেশাগত সংকটের প্রধান কারণসমূহ নিম্নরূপ:-
ক. ১ম শ্রেণীর চাকরিতে প্রবেশাধিকারে বৈষম্য
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক বৈষম্য, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সরাসরি প্রথম শ্রেণীর (৯ম গ্রেড) চাকরিতে আবেদনের অযোগ্যতা। রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তাঁদের ‘উপ-সহকারী প্রকৌশলী’ হিসেবে ২য় শ্রেণীতে গণ্য করা হলেও অনার্স বা স্নাতক প্রকৌশলীদের জন্য ৯ম গ্রেড সংরক্ষিত।  পিএসসি’র বিদ্যমান নীতিমালা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম শ্রেণীর চাকরির জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘একাডেমিক মাইলফলক’ বা বছরের হিসাব অনুসরণ করা হয়, যা বর্তমান ডিপ্লোমা বা কারিগরি শিক্ষা কাঠামোতে অনুপস্থিত।
খ. পদোন্নতি ও গ্রেড বৈষম্য
বর্তমানে স্নাতক প্রকৌশলীরা ৯ম গ্রেডে (সহকারী প্রকৌশলী) এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা ১০ম গ্রেডে (উপ-সহকারী প্রকৌশলী) চাকরিতে প্রবেশ করে। ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য সহকারী প্রকৌশলী পদে ৩৩% পদোন্নতি কোটা সংরক্ষিত আছে, যা বিএসসি প্রকৌশলীরা মেধাতন্ত্রের পরিপন্থী বলে মনে করেন ও এই কোটা পদ্ধতি বাতিল করতে চায়। ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা বলে এই কোটা নামে মাত্র, প্রবেশ পদে পদোন্নতি পেতে লেগে যায় ২০ বছর! নির্বাহী প্রকৌশলী হতে তো অনেকেই অক্কা পায়! আর ৯ম গ্রেড পাওয়া মানে এই নয় যে তিনি একজন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন। বরং তিনি তাঁর পদের সীমার মধ্যে থেকেও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উচ্চ স্কেলে মূল্যায়িত হন মাত্র।
গ. উপাধি ও পরিচয়
বিএসসি প্রকৌশলীদের দাবি ‘ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী’ উপাধি কেবল স্নাতক ডিগ্রিধারীদের জন্য সংরক্ষিত আছে। ইন্সটিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ, আইইবি’র মতে, প্রকৃত “ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী” কেবলমাত্র বিএসসি ডিগ্রিধারীরাই। ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের “ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার” বলা হলেও সামাজিকভাবে তারা “ইঞ্জিনিয়ার” নামে পরিচিত, আইনগত স্বীকৃতি নাই। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা তাঁদের দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই সামাজিক স্বীকৃতির দাবি জানান। তবে বাস্তবে বাংলায় ডিপ্লোমাধারীরা ইঞ্জিনিয়ার শব্দ ব্যবহার করে এবং স্নাতক (বিএসসি) ডিগ্রিধারীরা প্রকৌশলী শব্দ ব্যবহার করে! যদিও এটা কোন যৌক্তিক সমাধান মনে হয়না!
ঘ. বিএসসি সমমান বিতর্ক
শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ‘বিএসসি (পাস)’ সমমান মর্যাদা দেওয়ার একটি প্রস্তাব উঠেছিল। প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ, স্নাতক (বিএসসি) প্রকৌশলী ও বিএসসি শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানের ঘাটতি কেবল অভিজ্ঞতা দিয়ে পূরণ সম্ভব নয় যুক্তিতে এর তীব্র বিরোধিতা করে।
ঙ. রিট পিটিশন; বিএসসি প্রকৌশলী কর্তৃক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের হয়রানি!
ইদানিং দেখা যাচ্ছে বিএসসি প্রকৌশলীরাও ১০ম গ্রেডে দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরিতে আবেদন করছে! এতে করে ডিপ্লোমাদের চাকরির বাজার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কায় তারা প্রতিবাদ করছে। তাদের বক্তব্য ‘উপ-সহকারী প্রকৌশলী’ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য একটি বিশেষায়িত পদ। এখানে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের আসা উচিত নয়। কেননা তাদের জন্য প্রথম শ্রেণীর সকল চাকরির দরজা খোলা। বিএসসি শিক্ষার্থীরা বলে কেউ স্বেচ্ছায় যেতে চাইলে সুযোগ থাকা উচিত, সকল চাকরি মেধার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতামূলক হওয়া উচিত। চাকরির বাজারে রেষারেষির ফলে ১০ম গ্রেডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদটি ঐতিহ্যগতভাবে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য সংরক্ষিত থাকলেও বিএসসিধারীরা বঞ্চিত বোধ করেন। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই ব্যবস্থা প্রচলন করেছিলেন! গত কয়েক বছরে অনেকগুলো সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তির আবেদনে বিএসসি প্রকৌশলীরা উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে আবেদন করতে না পেরে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে ভিন্ন ভিন্ন রিট পিটিশন দায়েরের মাধ্যমে চাকরির বিজ্ঞপ্তিগুলি স্থগিত করে দিয়েছে। এতে ঐসব চাকরিতে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা বঞ্চিত হয়েছে, ক্যারিয়ার প্ল্যানিং নিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছে। আইনের মারপ্যাঁচে বিএসসি প্রকৌশলীরা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের হয়রানি করছে!
২. একাডেমিক বছরের হিসেবে ডিপ্লোমাধারীরা প্রথম শ্রেণীর অযোগ্য
বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তা হওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিক একাডেমিক যাত্রা প্রয়োজন। এর গাণিতিক হিসাবটি অত্যন্ত পরিষ্কার: মাধ্যমিক (এসএসসি/সমমান) পর্যন্ত ১০ বছর, উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি/সমমান) পর্যায়ে ২ বছর এবং ৪ বছরের স্নাতক (সম্মান) অথবা ৩ বছরের পাস কোর্সের সাথে ১-২ বছরের মাস্টার্স। অর্থাৎ, একজন প্রার্থী যখন ১৬ থেকে ১৭ বছরের একাডেমিক শিক্ষা পূর্ণ করেন, তখনই তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে আবেদনের যোগ্য বলে বিবেচিত হন। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক নিয়ম নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড।
৩. ডিপ্লোমায় একাডেমিক ঘাটতি: প্রধান অন্তরায়
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ক্ষেত্রে এই গাণিতিক সমীকরণটি ভিন্ন। একজন শিক্ষার্থী এসএসসি/সমমান পাসের (১০ বছর) পর সরাসরি ৩/৪ বছরের ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হন। ফলে তাঁর মোট একাডেমিক শিক্ষার বছর দাঁড়ায় ১০+৩/৪ = ১৩/১৪ বছর। যদিও রাষ্ট্রীয়ভাবে ডিপ্লোমাকে এইচএসসি’র চেয়ে উচ্চতর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এটি এখনো স্নাতক বা ডিগ্রি পর্যায়ের সমকক্ষ ১৬/১৭ বছরের শিক্ষার স্বীকৃতি পায়নি। এই ৩ বছরের ব্যবধানই মূলত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সরাসরি ১ম শ্রেণীর চাকরিতে আবেদনের পথে প্রধান আইনি ও কাঠামোগত বাঁধা। আইন বিজ্ঞানের থিউরি “সমান বছরের শিক্ষা অর্জন না করে সমান পদমর্যাদা দাবি করা” প্রশাসনিকভাবে চ্যালেঞ্জিং বলেই ব্যাখ্যা করে।
৪. আইনগত পার্থক্য ও ট্যাকনিক্যাল কারণ
বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, ডিপ্লোমা হলো মিড-লেভেল টেকনিক্যাল এডুকেশন। সরকারি চাকরির ধাপে ১০ম গ্রেড হলো ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের প্রবেশপথ, আর বিএসসি প্রকৌশলীদের জন্য তা ৯ম গ্রেড। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণীর প্রকৌশল পদের জন্য যে তাত্ত্বিক ক্রেডিট আওয়ার এবং গবেষণাপত্র প্রয়োজন, ডিপ্লোমা কারিকুলামে তার পরিবর্তে হাতে-কলমে ব্যবহারিক বা প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়। এই কাঠামোগত পার্থক্যের কারণেই সরকারি বিধিমালা তাঁদের সরাসরি ক্যাডার সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করেনি।
৫. সমাধান ও উত্তরণের পথ: ‘ব্রিজ কোর্স’ ও বিভিন্ন মডেল সুপারিশ
আমাদের প্রথমত অনুধাবন করতে হবে ডিপ্লোমা শিক্ষার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও এর সৃষ্টির নেপথ্য কারণসমূহ, যা সর্বসাধারণের কাছে বোধগম্য হওয়া জরুরি। রাষ্ট্র ও সামাজিক বাস্তবতার রুঢ় সত্য এই যে, শ্রেণী বৈষম্য ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে ছিল, আছে এবং হয়তো ভিন্ন ভিন্ন রূপে ভবিষ্যতেও থাকবে; ক্ষেত্রবিশেষে এটি আমাদের পছন্দ না হলেও এই রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই সামনে এগোতে হবে। তবে দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বৈষম্যকে ধ্রুব মেনে নিয়ে স্থবির থাকা চলবে না। বরং বিদ্যমান প্রতিকূলতার মাঝেও সংস্কারের পথ উন্মুক্ত রাখা, পরিস্থিতির গুণগত উন্নয়ন ঘটানো এবং পদ্ধতিগত পরিবর্তনের নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বৈষম্য নিরসনে পেশাগত মান অক্ষুণ্ণ রেখে উভয় পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য আনতে নিম্নোক্ত মডেলগুলো আলোচিত হচ্ছে:
ক. ব্রিজ কোর্স মডেল অনুসরণ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩ বছরের পাস কোর্সে ডিগ্রি সম্পন্নকারীরা যেমন ১/২ বছর মাস্টার্স করে ১ম শ্রেণীর যোগ্যতা অর্জন করেন, তেমনি ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের জন্য ডিপ্লোমা পরবর্তী ৩/২ বছরের একটি ব্রিজ কোর্স বা ‘অ্যাডভান্সড কোর্স বা মাস্টার্স কোর্স’ চালু করা যেতে পারে। এতে তাঁদের মোট শিক্ষা জীবন (১৩/১৪+৩/২=১৬) বছর পূর্ণ হবে এবং তাঁরা সরাসরি বিসিএস সহ সকল ১ম শ্রেণীর চাকরিতে আবেদনের যোগ্য হবেন। এসএসসি/সমমান এর পরিবর্তে এইচএসসি/ সমমান পরীক্ষার পরে ডিপ্লোমা কোর্স শুরু করা যাতে মোট শিক্ষা জীবন (১০+২+৩ বছর ডিপ্লোমা+১/২ বছর মাস্টার্স=১৬/১৭) বছর পূর্ণ হয় এবং তারা ১ম শ্রেণীর চাকরিতে প্রবেশাধিকার পায়।
খ. একাডেমিক সমতা
ডিপ্লোমা শিক্ষার মোট সময়কালকে কারিকুলাম উন্নয়নের মাধ্যমে অনার্সের মত ১৬/১৭ বছরে উন্নীত করা। ডিপ্লোমাধারী চাকরিজীবী বা পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে সরাসরি ‘সমমান’ না দিয়ে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য একটি নিবিড় ব্রিজ কোর্সের মাধ্যমে তারা উচ্চতর গণিত এবং বিজ্ঞানের ঘাটতি পূরণ করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে পারবে।
গ. ক্রেডিট ট্রান্সফার ব্যবস্থা বা আন্তর্জাতিক মডেল অনুসরণ
ভারত বা পাকিস্তানের মতো ডিপ্লোমা শেষে সরাসরি ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষে ভর্তির সুযোগ দেওয়া, যাতে ইচ্ছুক ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা মূলধারার স্নাতক (বিএসসি) প্রকৌশল শিক্ষার সাথে একীভূত হতে পারে। 
ঘ. মেধাভিত্তিক পদোন্নতি
চাকরিরতদের ক্ষেত্রে কেবল সংরক্ষিত কোটা বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নয়, পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিভাগীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা, যা পেশাগত মান নিশ্চিত করবে।
ঙ. পৃথক ক্যারিয়ার ট্র্যাক
সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির পরিবর্তে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য তাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ‘সিনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার’ বা ‘টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট’ এর মতো সমান্তরাল ও সম্মানজনক উচ্চতর গ্রেডের পদ সৃষ্টি করা।
চ. ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ১ম শ্রেণীতে উন্নীতকরণ
বর্তমানে একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার দুটি উপায়ে স্নাতক প্রকৌশলীদের সারি প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত হতে পারেন: প্রথমত, একমাত্র সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গাজীপুরে অবস্থিত ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) বা অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি অনার্স সম্পন্ন করে। সেক্ষেত্রে তাকে আবারও ৪ বছরের অনার্স সম্পন্ন করতে হয় যা শিক্ষা জীবনে অতিরিক্ত সময় ও ব্যায় সাপেক্ষ।  এসএসসি/সমমানে ১০ বছর+ডিপ্লোমা ৪ বছর+আবারও বিএসসি অনার্স ৪ বছর= ১৮ বছরের দীর্ঘ শিক্ষা জীবন! এটা প্র্যাকটিক্যাল না! দ্বিতীয়ত, ১০ম গ্রেডে যোগদানের পর নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হলে পদোন্নতির মাধ্যমে। বর্তমান পদ্ধতিতে এই পথগুলো ব্যতিরেকে সরাসরি ১ম শ্রেণীতে প্রবেশ করা আইনি ও প্রশাসনিকভাবে অসম্ভব। তাই এই ধারার শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী ক্যারিয়ার প্ল্যানিং করার সময় এই মৌলিক সত্যটি অনুধাবন করা জরুরি।
৬. ডিপ্লোমা শিক্ষার আদি দর্শন ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনীয়তা
রাষ্ট্র কাঠামোতে বিদ্যমান যে কোন নীতির শানে নূযুল ও দর্শন বুঝা দরকার। কেন জাতীয় শিক্ষানীতিতে এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ডিপ্লোমা ও বিএসসি শিক্ষার উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ ভিন্ন।বিএসসি প্রকৌশলীরা গবেষণা, পরিকল্পনা, উচ্চতর নকশা প্রণয়ন ও দুর্যোগ মোকাবেলায় বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন ও প্রয়োগে দক্ষতা অর্জন করেন। এই অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রীর মূল উদ্দেশ্য বিশেষজ্ঞ তৈরি করা। অন্যদিকে, ডিপ্লোমা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো, শিল্পে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কারিগর তৈরি করা, যারা তাত্ত্বিক গবেষণার চেয়ে প্রায়োগিক ও কারিগরি দক্ষতা বাস্তবায়ন ও  তদারকি কার্যক্রমে বেশি দক্ষ হবেন। ডিপ্লোমা শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো প্রায়োগিক দক্ষতা।  মূলত ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতেই জাতীয় শিক্ষানীতি ও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এই ধারার জন্ম।  মূলত নিম্নোক্ত তিনটি কারণে জাতীয় শিক্ষা নীতিতে এই শিক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে:
ক. দক্ষ টেকনিশিয়ান ও মিড-লেভেল ম্যানেজার তৈরি
যেকোনো শিল্পকারখানায় সব কাজ প্রকৌশলীরা করেন না, আবার সব কাজ অদক্ষ শ্রমিকরাও করতে পারেন না। এই দুই স্তরের মাঝে সমন্বয় করার জন্য এমন একদল দক্ষ জনবল প্রয়োজন যারা তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং ব্যবহারিক দক্ষতা, উভয় ক্ষেত্রেই পারদর্শী। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারগণ সেই শূন্যস্থান পূরণ করেন।
খ. দ্রুত কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান
সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় (অনার্স/মাস্টার্স) দীর্ঘ সময় ব্যয় করার পর কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয় না। কিন্তু ডিপ্লোমা শিক্ষা ৩-৪ বছরে একজন শিক্ষার্থীকে কারিগরিভাবে দক্ষ করে তোলে, ফলে সে দ্রুত দেশি-বিদেশি শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারে অথবা নিজেই ছোটখাটো শিল্প, ব্যবসা বা পেশা শুরু করতে পারে।
গ. অর্থনৈতিক সাশ্রয় ও উৎপাদনশীলতা
একটি দেশের সব মানুষকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার বানানো যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি সবার জন্য উচ্চতর পদের প্রয়োজনও নেই। কারখানায় উৎপাদন সচল রাখতে মাঠ পর্যায়ে প্রচুর পরিমাণ দক্ষ সুপারভাইজার বা উপ-সহকারী প্রকৌশলী প্রয়োজন হয়। ডিপ্লোমা শিক্ষা কম সময়ে ও কম খরচে এই বিপুল উৎপাদনশীল জনশক্তি তৈরি করে।
৭. সংকট নিরসনে সরকারের ভূমিকা
আন্দোলনের কারণে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের টনক নড়েছিল এবং বাংলাদেশে ডিপ্লোমা এবং স্নাতক (বিএসসি) প্রকৌশলীদের মধ্যে বিদ্যমান পেশাগত সংকট নিরসনে ঐ সরকার একটি ১৪ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করেছিল যা কার্য সম্পাদন করতে পারেনি। আশা করি বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এ বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ,টেকসই জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
উদাত্ত আহ্বান;
বর্তমানে এই খাতে যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, তার মূলে রয়েছে সেকেলে সিলেবাস এবং ডিপ্লোমা শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের নেতিবাচক বা স্থিতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। জাতীয় শিক্ষানীতির দুর্বলতা, অবহেলা এবং কাঠামোগত বৈষম্যই এই সংকটের জন্য দায়ী। এই দ্বন্দ্ব নিরসনে, অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে, একটি সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন আবশ্যক যা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের কারিগরি অভিজ্ঞতার মর্যাদা এবং বিএসসি প্রকৌশলীদের একাডেমিক যোগ্যতার সুরক্ষা দিবে।
আমার মনে হয়, উভয় পক্ষই কিছু বিষয়ে অনর্থক বাড়াবাড়ি করছে। কেবল নিজেদের অহমিকা বা ইগো বিসর্জন দিয়ে একে অপরের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেই এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য তো কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আত্মার পরিশুদ্ধি, নিজের ব্যক্তিত্বের বিকাশ এবং সর্বোপরি মানবতার কল্যাণ।
পরিশেষে, প্রকৌশল পেশার মান সমুন্নত রাখতে দ্রুত সংকট নিরসন করা দরকার। ডিপ্লোমা বা কারিগরি শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করা কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সাংবিধানিক অঙ্গীকার। আন্দোলনকারীদের প্রতি আমার আহ্বান, রাজপথে অহিংস আন্দোলনের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চালিয়ে যাওয়া জরুরি। গায়ের জোর বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ভাঙচুর করে নয়, বরং যুক্তি ও মেধা দিয়ে পলিসি মেকারদের টনক নাড়াতে হবে, গঠিত কমিটিকে কনভিন্স করার বুদ্ধিবৃত্তিক উপাদান সরবরাহ করতে হবে। জুলাই বিপ্লবের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে কারিগরি শিক্ষাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া ও বিএসসি প্রকৌশলীদের মর্যাদা সমুন্নত রাখা হোক আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার। হোক শিক্ষানীতির আমূল সংস্কার। ভালো থাকুক আমাদের আগামীর বাংলাদেশ।
লেখক: অ্যাডভোকেট মীর হালিম, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও পাবলিক পলিসি এন্ড স্ট্রাটেজি অ্যানালিস্ট।
ইমেইল: adv.mirhalim@gmail.com
ফোন: ০১৭১১৩৭৮৩৮২

Side banner 1 Side banner 2

উপ-সম্পাদকীয় এর আরও খবর