• ঢাকা
  • রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩
Bancharampur Barta
Bongosoft Ltd.

ডাক্তার-রোগীর সম্পর্কের সংকট 


বাঞ্ছারামপুর বার্তা | সোহাইল আহমেদ জুন ২০, ২০২৬, ০৮:৪০ পিএম ডাক্তার-রোগীর সম্পর্কের সংকট 

বিদেশি চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ: একটি কার্যকর সমাধান, নাকি আংশিক উপশম?
রোগীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বাস্থ্যখাতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। চিকিৎসাসেবার গুণগত মান, জনবল-সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সেবাদানের মানসিকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কিছু চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীর আচরণ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অপরদিকে চিকিৎসকদেরও ন্যায্য অভিযোগ রয়েছে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, অপর্যাপ্ত জনবল, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা। ফলে স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, যা রোগী ও চিকিৎসক উভয় পক্ষের জন্যই উদ্বেগের।
রোগীর প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার ব্যবধান
একজন রোগী যখন হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তিনি সাধারণত শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় থাকেন। সেই মুহূর্তে তিনি শুধু ওষুধ বা প্রেসক্রিপশন নন, একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে মানবিক আচরণ, সহমর্মিতা এবং আশ্বাসও প্রত্যাশা করেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক রোগীই অভিযোগ করেন যে তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা হয় না, পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয় না, কিংবা তাঁরা ন্যূনতম সম্মানটুকুও পান না। এই অভিজ্ঞতা রোগীদের মনে যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে, তা ধীরে ধীরে সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়।


চিকিৎসা পেশায় মানবিক মূল্যবোধ: সিমপ্যাথি, এম্প্যাথি ও কমপ্যাশন
চিকিৎসা পেশাটি কেবল বিজ্ঞানভিত্তিক একটি কার্যক্রম নয় এটি একটি গভীরভাবে মানবিক দায়িত্বও বটে। একজন দক্ষ চিকিৎসক বা নার্সের কেবল পেশাগত জ্ঞান থাকলেই চলে না; তাঁর মধ্যে মানবিক মূল্যবোধেরও সক্রিয় প্রতিফলন থাকতে হয়। এ ক্ষেত্রে তিনটি গুণ বিশেষভাবে অপরিহার্য। সিমপ্যাথি হলো রোগীর কষ্টের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের সক্ষমতা তাঁর যন্ত্রণাকে স্বীকার করা এবং তাঁর পাশে থাকার অঙ্গীকার। এম্প্যাথি আরও গভীর এটি রোগীর অবস্থান থেকে তাঁর অনুভূতি ও উদ্বেগ উপলব্ধি করার মানসিক সক্ষমতা। আর কমপ্যাশন হলো সেই উপলব্ধিকে কার্যকর সেবায় রূপান্তরিত করার আন্তরিক প্রয়াস রোগীর কষ্ট লাঘবের জন্য সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসা। বিশ্বের উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থাগুলোতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি এই মানবিক গুণাবলির চর্চায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে একজন রোগী চিকিৎসকের আচরণ ও যোগাযোগ দক্ষতা থেকে কেবল মানসিক শক্তিই পান না, বরং চিকিৎসার প্রতি তাঁর আস্থা ও চিকিৎসার কার্যকারিতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
বাস্তব সীমাবদ্ধতা: চিকিৎসকের দৃষ্টিকোণ
তবে বাস্তবতাকেও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের অনেক সরকারি হাসপাতালে একজন
চিকিৎসককে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী দেখতে হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শতাধিক রোগী সামলাতে হয়। একইভাবে নার্সরাও সীমিত জনবল নিয়ে অতিরিক্ত দায়িত্বের ভার বহন করছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রত্যেক রোগীকে কাঙ্ক্ষিত সময় দেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা কখনোই রোগী বা তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের গ্রহণযোগ্য কারণ হতে পারে না। কারণ স্বাস্থ্যসেবা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে পেশাদার দক্ষতার পাশাপাশি আচরণগত উৎকর্ষও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চাপের মধ্যেও সম্মানজনক আচরণ বজায় রাখা পেশাদারিত্বের অন্যতম মাপকাঠি।
বিদেশি চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ: সম্ভাবনা ও সীমা
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে সরকার কি পার্শ্ববর্তী বা অন্যান্য দেশ থেকে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে? বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগের সফল নজির রয়েছে। বাংলাদেশেও নির্দিষ্ট বিশেষায়িত খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি পূরণ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্যে সীমিত পরিসরে বিদেশি চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এর ফলে একদিকে জনবল-সংকট কিছুটা লাঘব হতে পারে, অন্যদিকে রোগীসেবা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং পেশাগত আচরণের ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড বা কিউবার মতো দেশের অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সরা নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ করলে শুধু চিকিৎসাসেবা প্রদানই নয়, তাঁরা স্থানীয় চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মশালা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। বিশেষত রোগীকেন্দ্রিক সেবাদানের সংস্কৃতি, কার্যকর যোগাযোগ এবং সিমপ্যাথি-এম্প্যাথি-কমপ্যাশনভিত্তিক চর্চার ক্ষেত্রে তাঁদের অভিজ্ঞতা মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে বিদেশি চিকিৎসক বা নার্স নিয়োগ কোনো জাদুকরি বা স্থায়ী সমাধান নয়। এটি কেবল একটি পরিপূরক হাতিয়ার হতে পারে, মূল সমস্যার বিকল্প নয়।
কাঠামোগত সংস্কার: সমস্যার মূলে হাত দেওয়া
স্বাস্থ্যখাতের সমস্যার মূল কারণগুলো যদি অমীমাংসিত থেকে যায়, তাহলে কেবল জনবল পরিবর্তন করে কাঙ্খিত ফল অর্জন করা সম্ভব নয়। এজন্য একটি সমন্বিত সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে: পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ ও ন্যায্য বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা; আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুবিধা সম্প্রসারণ; কার্যকর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা; চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিয়মিত আচরণগত ও যোগাযোগ-দক্ষতা প্রশিক্ষণ; এবং রোগীবান্ধব সেবা পরিবেশ তৈরি। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির একটি কার্যকর, স্বাধীন এবং বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। রোগীদের সঙ্গে অসদাচরণের প্রমাণিত ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি যাঁরা মানবিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সেবা প্রদান করছেন, তাঁদেরও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও উৎসাহ দেওয়া দরকার। অন্যদিকে, রোগী ও তাঁদের স্বজনদেরও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ভিত্তিতেই একটি সুস্থ, কার্যকর ও মানবিক চিকিৎসা পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে।
আস্থার পুননির্মাণ 
স্বাস্থ্যসেবা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। একজন রোগী চিকিৎসকের কাছে যাবেন আস্থা নিয়ে, ভয় নিয়ে নয়। আর একজন চিকিৎসক রোগীকে দেখবেন দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও সহমর্মিতার সঙ্গে এটাই হওয়া উচিত এই পেশার মূলভিত্তি। সিমপ্যাথি, এম্প্যাথি এবং কমপ্যাশনের চর্চা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একটি দক্ষ, মানবিক ও রোগীবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে রাষ্ট্রকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। কারণ একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল শক্তি কেবল আধুনিক প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি নয় বরং মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান, সহমর্মিতা এবং সেবার আন্তরিক মানসিকতা।
লেখক: সোহাইল আহমেদ
লেখক ও সাংবাদিক

Side banner 1 Side banner 2