• ঢাকা
  • শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Bancharampur Barta
Bongosoft Ltd.
শিক্ষা ও পরিবেশ আজ চরম সংকটে

বাঞ্ছারামপুরের বিদ্যাপীঠের বুকে অস্থায়ী পশুর হাট


বাঞ্ছারামপুর বার্তা | অ্যাডভোকেট মীর হালিম মে ২৩, ২০২৬, ০২:৪০ পিএম বাঞ্ছারামপুরের বিদ্যাপীঠের বুকে অস্থায়ী পশুর হাট

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো একটি জাতির মেধা ও মনন বিকাশের পবিত্রতম আঙিনা। যেখানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কোলাহল আর বইয়ের পাতার শব্দে মুখরিত থাকার কথা, সেখানে যদি পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে বসে পশুর হাট, তবে তা কেবল অনভিপ্রেতই নয়, বরং চরম উদ্বেগজনক। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা মাঠে অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা প্রদান করা হয়েছে। আমার জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলাতেও এর ছোঁয়া লেগেছে! স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের একাংশের যোগসাজশে নিয়ম ভেঙে এই আয়োজন সচেতন জনতার মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। কতিপয় ব্যক্তির পকেট ভারী করার এই বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা আজ আমাদের জাতীয় ও জনস্বার্থকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এলাকার অনেক শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়লেও অবলা পশুর সৌভাগ্য হয় স্কুলে যাওয়ার! দিনশেষে গোয়ালঘরে পরিণত হওয়ার ভাগ্যবরণ করে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ইট-পাথরের নির্বাক ভবন!
১. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী পশুর হাট বেআইনি; প্রশাসন দেখেও দেখে না
সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে পশুর হাট বসানো কোনো সাধারণ অনিয়ম নয়, এটি সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। রাষ্ট্র ও উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্থানীয় প্রশাসন কীভাবে এই ইজারা প্রদান করে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। অথচ উচ্চতর প্রশাসন, শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কাগজে-কলমে আইন লিখেই যেন তাদের দায়িত্ব শেষ মনে করছে!
ক. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা ও পরিবেশ আইন লঙ্ঘন: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট প্রশাসনিক নির্দেশনা রয়েছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পদ বা মাঠ কেবল শিক্ষামূলক এবং শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার কাজেই ব্যবহৃত হবে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বা পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কোনো কাজে মাঠ ব্যবহার করা যাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চারপাশ শান্ত ও স্বাস্থ্যকর রাখা আইনি বাধ্যবাধকতা। স্কুল মাঠে পশুর হাট বসালে তীব্র শব্দদূষণ ও পশুর বর্জ্যের দুর্গন্ধে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়, যা শিক্ষার্থীদের তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে এবং প্রচলিত আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
খ. স্থানীয় সরকার বিভাগের স্থায়ী নীতিমালা লঙ্ঘন: বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী পরিপত্রের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ, খেলার মাঠ, রেল লাইন এবং জাতীয়/আঞ্চলিক মহাসড়কের উপর বা সন্নিকটে কোন অস্থায়ী পশুর হাট বসানো যাবে না।” দেশের প্রায় সকল জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এই নির্দেশনার চিঠি পেয়েও তা লঙ্ঘন করছেন। এ যেন সর্ষের মধ্যেই ভূত!
গ. হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২৩ লঙ্ঘন: এই নতুন আইন অনুযায়ী, যেকোনো হাট-বাজারের জন্য নির্দিষ্ট ‘তফসিলভুক্ত’ বা নির্ধারিত জায়গা থাকতে হয়। বিদ্যালয় মাঠ কোনো বাণিজ্যিক তফসিলভুক্ত জায়গা নয়। ফলে এখানে হাট বসানো এই আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
ঘ. মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আদেশ লঙ্ঘন: বিভিন্ন সময়ে জনস্বার্থে দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট বিভাগ) সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে কোনো অবস্থাতেই পশুর হাট বসানো যাবে না। আদালতের এই স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা সরাসরি কনটেম্পট অফ কোর্ট বা আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হয়।
২. অস্থায়ী হাটের ক্ষতিকর দিক: শিক্ষার পরিবেশ বিপন্ন ও লাভের কোঠায় শূন্য
স্কুল-কলেজের মাঠে যখন সারি সারি পশু এসে দাঁড়ায়, তখন বাচ্চারা একে অপরের সাথে কৌতুক করে বলে—“দেখ দেখ, গরু-ছাগলও আজ স্কুলে এসেছে!” এই কৌতুকের অন্তরালে যে করুণ বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা নিম্নরূপ:
ক. পড়াশোনায় চরম ব্যাঘাত ও মানসিক ক্ষতি: পশুর ডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার চিৎকার, মাইকের কানফাটানো আওয়াজ আর টাকার লেনদেনের এই বাণিজ্যিক হট্টগোলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। এই পরিবেশ শিক্ষার্থীদের কোমলমতি মনস্তত্ত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
খ. তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ: হাট শেষে মাঠজুড়ে পশুর মলমূত্র, উচ্ছিষ্ট খাবার ও পচা আবর্জনা ফেলে রাখা হয়। বর্ষাকালীন বৃষ্টির সাথে মিশে এই বর্জ্য পুরো এলাকায় এক নরককুণ্ড তৈরি করে, যা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ডেঙ্গুসহ নানা রোগবালাইয়ের জন্ম দেয়। অযাচিত ও অনাকাঙ্খিত এই পরিবেশ দূষণের ফলে শিক্ষার্থীরা তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানে এসে তারা যেন বিনামূল্যে রোগ নিয়ে ঘরে ফিরে যায়! জনস্বাস্থ্যের এসব ঝুঁকি দেখার যেন কেউ নেই!
গ. খেলার মাঠ ও প্রাতিষ্ঠানিক সৌন্দর্য চিরতরে বিনষ্ট: হাটের খুঁটি গাড়ার কারণে এবং পশুর পায়ের চাপে মাঠের ঘাস ও মাটি উপড়ে যায়। বর্ষার মৌসুমে কাদা জমে মাঠটি দীর্ঘদিনের জন্য শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও চলাচলের পুরোপুরি অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে এসব মাঠ মেরামতে আবার সরকারকেই নানাভাবে তহবিল বরাদ্দ দিতে হয়! যুক্তির খাতিরে ধরুন ইজারা থেকে আয় দশ হাজার টাকা, অথচ মাঠের মেরামত ব্যয় দুই লক্ষ টাকা! সারা দেশে এমন ক্ষতিগ্রস্ত বহু মাঠ যুগের পর যুগ আর মেরামত হয় না। এ যেন অন্ধের দেশে আয়না বিক্রির মতোই উপহাস! বিচিত্র এই দেশ!
ঘ. প্রতিষ্ঠানের লাভ ‘শূন্যের কোঠায়’: বর্তমান যুগে প্রতিটি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় সরকার থেকে পর্যাপ্ত বাজেট, মেরামত তহবিল ও অনেক উন্নয়ন প্রকল্প দেওয়া হয়। এই সামান্য হাটের টাকার ওপর কোনো প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া, এই ইজারার সিংহভাগ টাকা চলে যায় স্থানীয় প্রভাবশালী ইজারাদারের পকেটে; আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কপালে জোটে কেবল ভাঙা মাঠ আর একরাশ আবর্জনা। শতভাগ ফেল করা স্কুলের মাঠেও যখন শিক্ষার চেয়ে পশুর হাট নিয়ে মাতামাতি হয়, তখন তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপহাসের পাত্রে পরিণত করে। বিগত ১০ বছরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হিসাব যাচাই করে দেখলে এই মহামূল্যবান স্কুল মাঠের ইজারা থেকে আয়ের পরিমাণ প্রায় শূন্যই পাওয়া যাবে! এখানকার আয় ফুটবলের মতো গড়াগড়ি করে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রশাসনের হাত ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যায়! এ যেন মাধবকুণ্ডের ঝর্ণার স্বচ্ছ পানি গড়াতে গড়াতে মাটিতে মিশে সাধারণ নর্দমার পানি হয়ে যাওয়ার মতো।
“শিক্ষার নির্মল পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক নান্দনিকতা সুরক্ষার্থে সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে অস্থায়ী পশুর হাটের এই বেআইনি ইজারা অবিলম্বে বাতিল অথবা স্থানান্তর করা হোক। ইজারা গ্রহীতাদের বাণিজ্যিক দাবির বিপরীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকল্প হিসেবে নিকটবর্তী কোনো উন্মুক্ত স্থান বা স্থায়ী হাটে এই অস্থায়ী পশুর হাটের দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হোক। অস্থায়ী পশুর হাটের তালিকা থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থায়ীভাবে আওতামুক্ত করতে অতি দ্রুত, যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা কেবল সময়ের দাবিই নয়, বরং আইনি বাধ্যবাধকতা। এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের কালক্ষেপণ জনসেবার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী হিসেবেই বিবেচিত হবে। আইন ও ন্যায়বিচারের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকুক; মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস ফিরুক আমাদের প্রিয় বিদ্যাপীঠের প্রাঙ্গণে।”
৩. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বনাম আধুনিক ‘মব কালচার’:
 অতীতে কিছু মাদ্রাসা নিজস্ব তহবিলের অভাব, এতিমদের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ড কালেকশনের স্বার্থে সীমিত পরিসরে নিজেদের মাঠে হাটের রেওয়াজ শুরু করেছিল। এতিমখানাগুলোর পরিচালনা সাধারণত সাধারণ মানুষের দানের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সামাজিক ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সেটিকে ‘ব্যতিক্রমী বিবেচনা’ দেওয়া যেতে পারে, যা সময়ের সাথে সাথে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে।
এদিকে সমাজের একশ্রেণির দুষ্টচক্র ভাবল “মাদ্রাসা পারলে আমাদের স্কুল ফাঁকা যাবে কেন?” ফলে গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কৌশলগতভাবে ও জোরপূর্বক এই বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। স্থানীয় প্রভাব বিস্তার করে, অনেক ক্ষেত্রে ‘মব’ বা মব-সদৃশ পরিবেশ তৈরি করে প্রশাসনকে ভুল বুঝিয়ে এই ইজারা আদায় করা হয়। অধিকাংশ ইজারাই নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি, প্রধান শিক্ষক, স্থানীয় শিক্ষক ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যোগসাজশে হয়ে থাকে! যেসব প্রধান শিক্ষক অস্থানীয় তারা এসব বিষয়ে খুবই চাপে থাকেন। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ কখনো এর বখরা পান, আবার কখনো পরিচালন ব্যয় থেকে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেন! আহা! এ যেন দশ চক্রে ভগবান ভূত! 
৪. পশুর অস্থায়ী হাট: বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ভয়ংকর চিত্র
আজ কপালে কলঙ্কের তিলক: বিদ্যাপীঠ কেন পশুর খোঁয়াড়! সারা দেশের চিত্র খুঁজতে গুগল সার্চ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দেয়ালে চোখ রাখলেই বহু অভূতপূর্ব ও লজ্জাজনক সংবাদের কপি পাওয়া যাবে। আমার জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ফেসবুক ওয়ালগুলো এখন এই তপ্ত বিতর্কে উত্তাল। গত ১৩ মে ২০২৬ তারিখে ‘বাঞ্ছারামপুর বার্তা’য় প্রকাশিত একটি সংবাদ উপজেলার সচেতন মহলের বিবেককে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে নামমাত্র রাজস্ব আদায়ের খতিয়ান দেখাতে গিয়ে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা প্রশাসন উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে একযোগে ৩০টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা প্রদান করেছে। উপজেলা সদর থেকে চারদিকে ১০ কিলোমিটার বৃত্তের এই ছোট্ট এলাকায় এত পশুর হাটের প্রয়োজন আছে বলে সাধারণ জনগণ মনে করে না।
জনসাধারণের তীব্র আপত্তি ও সংক্ষুব্ধতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, স্থানীয় একশ্রেণির প্রভাবশালীদের অদৃশ্য চাবুকের টানে পাঁচটি সম্পূর্ণ নতুন হাট সৃষ্টি করা হয়েছে। নতুন ব্যবসা কেন্দ্র হয়েছে একটি মাজার, একটি মাদ্রাসা এবং একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আধ্যাত্মিক সাধনার মাজার কিংবা শিশুর বর্ণমালার প্রাঙ্গণ, কোনো কিছুই বাদ যায়নি এই বাণিজ্যিক আগ্রাসন থেকে। আজ আমাদের পরম শ্রদ্ধার বিদ্যাপীঠগুলো যেন কোনো এক জাদুবলে গোয়ালঘরের বর্ধিত অংশে রূপান্তরিত হতে চলেছে!
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র হলো, এই ৩০টি হাটের মধ্যে ১১টি হাটই বসানো হয়েছে সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বুক চিরে। এই তালিকায় রয়েছে, ধারিয়ারচর নুরুল ইসলাম কলেজ, ফরদাবাদ ড. রওশন আলম কলেজ, বাহেরচর ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম কলেজ, ভুরভুরিয়া আদর্শ স্কুল এন্ড কলেজ, শাহ রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়, আইয়ুবপুর ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়, রূপসদী জামিদা মনসুর আলী উচ্চ বিদ্যালয়, ছলিমাবাদ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, উজানচর কে এন উচ্চ বিদ্যালয়, হোগলাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং চরছয়ানী মাদ্রাসা মাঠ।
ভাবতে গা শিউরে ওঠে, আগামী পবিত্র ঈদ পর্যন্ত সপ্তাহের দুই থেকে তিন দিন এই মাঠগুলোতে চলবে অবর্ণনীয় হট্টগোল, কাদা আর পশুর মলমূত্রের রাজত্ব। যে ভবনের দেয়ালে শোভা পাওয়ার কথা ছিল কালজয়ী মনীষীদের বাণী কিংবা জ্ঞানের আলো ছড়ানো স্লোগান; সেখানে আজ বড় বড় সাইনবোর্ডে ঝোলানো হবে ‘বিশাল-বিরাট গরু-ছাগলের হাট’-এর বিজ্ঞাপন।
এই চরম অবক্ষয় নিয়ে সারা দেশে ও চায়ের টেবিলে ক্ষোভের ঝড় উঠলেও স্থানীয় সাংবাদিকতা আর প্রশাসনের অন্দরমহলে এক রহস্যময়, অস্বাভাবিক নীরবতা বিরাজ করছে। এই ট্র্যাজেডির কবি-কুশীলব আর তথাকথিত বিবেকবানদের নীরবতার ভাষা বোঝা সত্যিই বড় কঠিন! বর্ষার দিনে ডাল-চাল মিলিয়ে খিচুড়ি রাঁধার যে চিরচেনা আনন্দ, এই ক্ষমতার ভাগাভাগির মহোৎসবে লিপ্ত থাকা মানুষেরা হয়তো সেই লোভনীয় স্বাদ কোনোভাবেই ভুলতে পারছে না। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছে, কতিপয় মানুষের সাময়িক উদরপূর্তির খেসারত হিসেবে একটি জনপদের শিক্ষার মেরুদণ্ড আজ পঙ্গু হতে চলেছে।
“জনস্বার্থে এবং শিক্ষার পবিত্রতা রক্ষার্থে বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সকল স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার মাঠে অস্থায়ী পশুর হাটের অনুমতি বাতিলের জন্য বাঞ্ছারামপুর উপজেলার শিক্ষানুরাগী ও সচেতন জনগণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সম্মানীয় জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে হাটগুলি যত দ্রুত সম্ভব অন্যত্র স্থানান্তরের উদ্যোগ বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কতিপয় ব্যক্তির স্বার্থে আমাদের জাতীয় ও জনস্বার্থ বিসর্জন দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তটি একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল এবং আশা করে অবিলম্বে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার মাঠগুলোকে অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা থেকে মুক্ত ঘোষণা করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।”
৫. বিকল্প ব্যবস্থা ও জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান
সারা দেশে বেড়েছে হাট-বাজারের সংখ্যা। একইভাবে বাঞ্ছারামপুর উপজেলাতেও এখন গ্রামে গ্রামে স্থায়ী বাজারের অভাব নেই। উদাহরণস্বরূপ, রূপসদী গ্রামেই উত্তর বাজার, বউ-বাজার, দক্ষিণ বাজার ও জামাই-বাজারসহ চারটি সুপরিচিত স্থায়ী বাজার রয়েছে। রূপসদী জমিদা মনসুর আলী হাই স্কুলের মাঠ ব্যবহার না করে এসব স্থায়ী বাজার কিংবা কোনো উন্মুক্ত স্থানকে বিকল্প হিসেবে অনায়াসেই বেছে নেওয়া যেত। একইভাবে বিকল্প চিন্তায় অন্যান্য হাটের আয়োজন হয়তো করা যেত! আমরা বিশ্বাস করতে চাই, প্রশাসন এসব ইজারা অনিচ্ছাকৃত ও ভুলবশত প্রদান করেছে বা অতীতের ভুল চর্চাকে পুনর্বিবেচনা ছাড়াই চলমান রেখেছে। কতিপয় ব্যক্তির পকেট ভারী করার স্বার্থে আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য, আইনি এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষার গুণগত মান ও পরিবেশ রক্ষা করা বর্তমান সরকারের অন্যতম জাতীয় অগ্রাধিকার।
তাই আইন-কানুন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে জাতীয় ও জনস্বার্থে এবং শিক্ষার নির্মল পরিবেশ ও পবিত্রতা রক্ষার্থে; বাঞ্ছারামপুর উপজেলাসহ সারা দেশে স্থানীয় সংসদ সদস্য, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-দের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যে, অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা তালিকা থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আওতামুক্ত করার ক্ষেত্রে অতিদ্রুত, যথাযথ, প্রয়োজনীয় এবং কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা শুধু আবশ্যকই নয়, তা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে যত কালক্ষেপণ হবে, তা জনসেবার ক্ষেত্রে অবহেলা হিসেবেই বিবেচিত হবে। আইন ও ন্যায়বিচারের শাসন বজায় থাকুক, মুক্ত হোক আমাদের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ।
লেখক:অ্যাডভোকেট মীর হালিম, পাবলিক পলিসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি অ্যানালিস্ট।

Side banner 1 Side banner 2