একটি দেশের উন্নয়নের মূল নির্ভর করে তার মানবসম্পদের গুণগত মানের ওপর, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য গতানুগতিক শিক্ষা সংস্কার যথেষ্ট নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সুদূরপ্রসারী, টেকসই ও বিজ্ঞানভিত্তিক ‘বাংলাদেশ এডুকেশন মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন অপরিহার্য।
মাস্টার প্ল্যান হলো জাতির অস্তিত্ব ও সমৃদ্ধির অপরিহার্য রক্ষাকবচ, দীর্ঘমেয়াদি অটল ভিশনের বৈজ্ঞানিক রোডম্যাপ। বিচ্ছিন্ন সংস্কারের পরিবর্তে সমন্বিত, তথ্যনির্ভর মহাপরিকল্পনা সম্পদের অপচয় রোধ করে, বিশৃঙ্খলা নির্মূল করে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। শিক্ষাক্ষেত্রে এখন এটিই সবচেয়ে জরুরি, শিক্ষাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে তুলে এক অটুট জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করা। এর ভিশন হলো একটি মেধাভিত্তিক, মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা উদ্ভাবনী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নেতৃত্ব নিশ্চিত করবে।
ইতিহাস পাঠে জানা যায় স্বাধীনতার পর থেকে গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে একাধিক কমিশন ও কমিটি গঠিত হয়েছে। এই নীতিগুলোর পরতে পরতে যেমন ছিল শিক্ষা উন্নয়নের আকাক্ষা, তেমনি তৎকালীন রাজনৈতিক দর্শনের ছাপও ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রথমবারের মত আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক গঠিত কুদরত-এ-খুদা কমিশন ১৯৭৪ সালে রিপোর্ট প্রকাশ করে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, কর্মমুখী শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের চিন্তা ছিল। জনআকাঙ্ক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবাদের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ছিল উপেক্ষিত। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর, ১৯৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সরকার শামসুল হকের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করে। কুদরত-এ-খুদা কমিশনের রিপোর্টের বিপরীতে এটি জনআকাঙ্ক্ষা, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটায়। এর মাধ্যমে গণশিক্ষা কার্যক্রম, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং সাধারণ শিক্ষার সাথে ইসলামী শিক্ষার মেলবন্ধন ঘটানো হয়।
১৯৮৭ সালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের আমলে গঠিত মজিদ খান কমিশন প্রশাসনিক সংস্কার ও আরবি শিক্ষার ওপর জোর দিলেও ছাত্র আন্দোলনের মুখে তা তীব্র বিরোধিতার শিকার হয়। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০ প্রণয়ন করে। এর মূল দর্শন ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতা। এরপর বিএনপি-জামায়াত সরকার মনিরুজ্জামান মিঞা কমিশনের সুপারিশে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৩ প্রবর্তন করে যার মূল ভিত্তি ছিল ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয় করা। ওয়ান এলিভেনের পর আবারো আওয়ামী লীগ সরকার কবীর চৌধুরী কমিশনের মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন করে যা কুদরত-এ-খুদা কমিশনের আদর্শ ও আধুনিকতার সমন্বয়ের অন্তরালে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত হানে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত প্রণীত তিনটি জাতীয় শিক্ষানীতি মূলত দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক ধারার আদর্শিক প্রতিফলন।
২০১০ সালের পর, এখনো পর্যন্ত নতুন কোন শিক্ষানীতি না হলেও, আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ২০২১ সালে প্রণীত ২০২৩ সালে কার্যকর হওয়া ‘নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম’ দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও বিতর্কিত পরিবর্তনের সূচনা করে। এই কারিকুলামের মাধ্যমে নবম-দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ তুলে দিয়ে সবার জন্য অভিন্ন ১০টি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। হালকা মূল্যায়ন পদ্ধতি ছিল অবিশ্বাস্য ও বিতর্কিত, শিক্ষার মান নিম্নগামী হয়ে যায়। এতে প্রথাগত পরীক্ষার চেয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। সেরাদের তালিকায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে পড়ে, একাডেমিক মান নিম্নগামী হয়, বেকারত্ব বেড়ে যায়, চাকুরীর বাজারে দুর্নীতি ও কোটার কারণে বৈষম্য তৈরি হয়, দীর্ঘায়িত হয় স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা, ছাত্র সমাজ ফুঁসে ওঠে, জনগণ সমর্থন দেয় যার ফলে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিতর্কিত কারিকুলামটি নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন উঠে। বিশেষজ্ঞরা বলেন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যর্থ এই শিক্ষানীতি দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে জনদাবির মুখে, ড. মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুনরায় নবম শ্রেণিতে বিভাগ বিভাজন যথা বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চালু এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনে। এখনেও জোড়াতালি দিয়ে কোনরকম সময়কে ধামাচাপা দেওয়া হয়।
এখন ঐতিহাসিক সময় এসেছে, অতীতের ভুল ভ্রান্তি দূর করে, ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ও আদর্শিক ভিত্তি মজবুত করা। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রধান রূপকার ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালে শিক্ষা উপদেষ্টা পরিষদ বা শামসুল হক কমিটির মাধ্যমে তিনি গণশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার যে বীজ বপন করেছিলেন তা ২০০৩ সালে বিএনপি সরকার কর্তৃক মনিরুজ্জামান মিঞা শিক্ষা কমিশন প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতির মাধ্যমে তা আরও পল্লবিত হয়েছিল। জাতীয়তাবাদী আদর্শের সেই শিক্ষা দর্শনের মূলে ছিল, ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয় সংহতি এবং আধুনিক বিজ্ঞানমুখী দৃষ্টিভঙ্গির চমৎকার সমন্বয়। কল্পিত ‘বাংলাদেশ এডুকেশন মাস্টার প্ল্যান’ হবে সেই আদর্শের এক আধুনিক সংস্করণ, যা ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের ইমারত গড়বে, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে আগামীর বাংলাদেশ।
এখন ঐতিহাসিক সুযোগ। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা দরকার। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯৭৯-এর শিক্ষা উপদেষ্টা পরিষদ ও ২০০৩-এর জাতীয় শিক্ষানীতির আদর্শ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয়তাবাদ ও আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয়, এক আধুনিক সংস্করণ হিসেবে ‘বাংলাদেশ এডুকেশন মাস্টার প্ল্যান’ গড়ে তোলা যেতে পারে।
এই মাস্টার প্ল্যানের জরুরি কারণ: শিক্ষানীতিতে ধারাবাহিকতার অভাব। প্রতিটি সরকার পূর্ববর্তী নীতি বাতিল করে নতুন করে শুরু করে, ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ব্যর্থ হয়। এ প্রেক্ষিতে শহীদ জিয়াউর রহমানের অনুসরণে একটি শক্তিশালী ‘জাতীয় শিক্ষা উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠন করে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যাবশ্যক। বিশ্বের সফল মডেল অনুসরণ করে প্রয়োগযোগ্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করলে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব। এই লক্ষ্যে নিম্নে কিছু প্রস্তাবনা পেশ করছি।
১. বাংলাদেশের সমাজ অনুধাবন; বাংলাদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থান, ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা। যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য ব্যতিক্রম মেনে শিক্ষার সকল ধারাকে একই ধারায় পরিণত করা। নারী শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ, উচ্চ শিক্ষায় গবেষণা বৃদ্ধি ও কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ানো।
২. বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ অনুমান: বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ অনুমান পূর্বক তা মোকাবেলায় সক্ষম নাগরিক তৈরির উদ্দেশ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা। বিশ্বব্যাপী গৃহীত বুদ্ধির আদর্শ ও মানগুলিকে এখানে প্রয়োগ করা।
৩. বৈশ্বিক বয়সের সমন্বয়; ২২ বছরে গ্র্যাজুয়েশন: বিশ্বব্যাপী গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার স্বীকৃত ও গৃহীত বয়স ২২ বছর। প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বছরের হিসাব বৈশ্বিক মানদণ্ডের সাথে মিল রেখে ৩+ বছর বয়স থেকে প্রাক-প্রাথমিক শুরু করা হবে। লক্ষ্য হবে যেকোনো মূল্যে ৫+৫+২+৪=১৬ বছরের স্কুল জীবন ২২ বছর বয়সের মধ্যে একজন শিক্ষার্থীর অনার্স বা গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা, যাতে সে কর্মজীবনে প্রবেশের পর্যাপ্ত সময় পায় এবং বিশ্বব্যাপী উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে সমতা অর্জন করে।
৪. বিভাগ বিভাজন ও আধুনিকায়ন:
অবকাঠামো ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন ব্যবস্থার পাশাপাশি সায়েন্স, আর্টস ও কমার্স বিভাজন বজায় রেখে প্রতিটি বিভাগকে যুগোপযোগী করে তোলা। বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে ল্যাব-নির্ভরতা বাড়ানো এবং আর্টস ও কমার্সে বৈশ্বিক অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী নতুন বিষয় যুক্ত করা প্রয়োজন।
৫. মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন ও সমমর্যাদা:
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৩-এর আলোকে মাদ্রাসায় সায়েন্স, আর্টস ও কমার্স বিভাগ চালু করা যেতে পারে। ভোকেশনাল ট্রেনিং যুক্ত করার মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মূলধারার কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলা, যাতে তারা উচ্চশিক্ষার সমান সুযোগ পায়।
৬. যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল কারিকুলাম’ ও ধারাবাহিকতা: যুক্তরাজ্যের জিসিএসই এবং এ-লেভেল কাঠামোর আদলে বাংলাদেশে একটি অভিন্ন ও জাতীয় মানদণ্ড নির্ধারণ করা যেতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য হবে মুখস্থ বিদ্যার বদলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌক্তিক বিশ্লেষণ ক্ষমতা তৈরি করা, যা তাদের বৈশ্বিক গ্র্যাজুয়েট হিসেবে গড়ে তুলবে।
৭. যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবন ও ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মডেলে উচ্চশিক্ষার গবেষণাগারে বিপুল বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। শিক্ষার্থীদের কেবল উত্তর দিতে নয়, বরং ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’ এই প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মৌলিক গবেষণার জন্য বিশেষ রাষ্ট্রীয় তহবিল গঠন করা প্রয়োজন।
৮. রুয়ান্ডা মডেলের আইটি ও ভাষা বিপ্লব:
আফ্রিকার বিস্ময়, রুয়ান্ডা, ১৯৯৪ সালের গণহত্যার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো উত্থান ঘটেছে কেবল তাদের সাহসী শিক্ষানীতির কারণে। রুয়ান্ডার মতো ‘ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড’ কর্মসূচি এবং প্রাথমিক স্তর থেকেই কোডিং বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
৯. জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষা শিক্ষা:
বিশ্ববাজার ও কূটনৈতিক মঞ্চে নেতৃত্ব দিতে বাংলার পাশাপাশি জাতিসংঘের ৬টি অফিশিয়াল ভাষা (ইংরেজি, আরবি, চীনা, ফরাসি, রুশ ও স্প্যানিশ) শেখার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত একটি বিদেশি ভাষায় দক্ষতা অর্জন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
১০. ফিনল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষক উন্নয়ন মডেল: শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও বেতন কাঠামো আমূল পরিবর্তন করা প্রয়োজন। ফিনল্যান্ডের মতো মেধার বিচারে টপ ৫% গ্র্যাজুয়েটদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা এবং তাদের পেশাগত স্বাধীনতার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোকে এক একটি ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ার পরিকল্পনা করা।
১১. শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও ধারাবাহিকতা:
শ্রীলঙ্কার ১৯৪৫ সালের ‘কান্নানগারা নীতি’র মতো একটি দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা অতিব জরুরী, যা সরকার পরিবর্তনেও বদলাবে না। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার ব্যয় রাষ্ট্র বহন করা এবং পুষ্টি নিশ্চিত করতে ‘স্কুল মিল’ কর্মসূচি জোরদার করার শ্রীলংকান নীতি বাংলাদেশে প্রয়োগ করা যায় কিনা তার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।
১২. জার্মানির ‘ডুয়েল এডুকেশন’ ও কারিগরি সংযোগ: জার্মানির মতো তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি সরাসরি শিল্পকারখানায় হাতে-কলমে কাজ শেখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এতে পড়াশোনা শেষ করার আগেই একজন শিক্ষার্থী চাকরির বাজারের জন্য পূর্ণ প্রস্তুত হতে পারবে।
১৩. জাপানের নৈতিক শিক্ষা ও চরিত্র গঠন: জাপানি মডেলে প্রাথমিক স্তরে (চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত) পরীক্ষার চাপ না রেখে নৈতিকতা, নিয়মনিষ্ঠা, পরিচ্ছন্নতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের ওপর ৮০% গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। উদ্দেশ্য হবে, আগে একজন সুনাগরিক, তারপর একজন মেধাবী ছাত্র গড়া।
১৪. দক্ষিণ কোরিয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় মেধা যাচাই: দক্ষিণ কোরিয়ার মতো প্রতি বছর ‘ন্যাশনাল স্কিল টেস্ট’ এবং বৃত্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ মেধাবীদের রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা। শিক্ষাকে একটি জাতীয় আন্দোলন হিসেবে দেখা হবে যা দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান অস্ত্র।
১৫. সিঙ্গাপুরের ‘ইন্ডাস্ট্রি ইন্টিগ্রেশন’: আগামী ৫ বা ১০ বছর পর বৈশ্বিক বাজারে কোন ধরণের চাকরির চাহিদা আসবে, তা মাথায় রেখে কারিকুলাম নিয়মিত আপডেট করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট সেক্টরের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ নিশ্চিত করা একান্ত দরকার।
বাংলাদেশের বর্তমান মন্ত্রিসভায় এক বিরল সমন্বয় আমরা দেখতে পাচ্ছি। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী আ.ন.ম এহসানুল হক মিলন এবং মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, উভয়েই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, তারুণ্যদীপ্ত ও কর্মোদ্যমী। তাদের এই উদ্দীপনার সাথে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ, প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপোসহীনতা, বিএনপি’র ৩১ দফা, ইশতেহার, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তারুণ্যের ভাবনা ‘আই হ্যাভ এ প্লান’ যুক্ত হয়ে পরিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ‘বাংলাদেশ এডুকেশন মাস্টার প্ল্যান’ কেবল একটি সরকারি দলিল নয়, এটি হবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার সনদ, মেরুদণ্ড, নতুন দিনের মাইলফলক, বেইসলাইন।
বাংলাদেশের এই নবজাগরণ দেখতে দেশবাসীর প্রত্যাশার পাশাপাশি পৃথিবীও তাকিয়ে আছে। আমাদের সন্তানদের হাতে সার্টিফিকেট নয়, বরং ‘ভবিষ্যৎ’ তুলে দেওয়ার সময় এখনই। শিক্ষা হোক একটি জাতীয় অঙ্গীকার, ‘ বাংলাদেশ এডুকেশন মাস্টার প্ল্যান’ হোক সেই স্বপ্নের প্রথম ধাপ যার মূলমন্ত্র হোক “সবার আগে শিক্ষা, সবার আগে বাংলাদেশ”।
লেখক: অ্যাডভোকেট মীর হালিম, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, পলিসি অ্যানালিস্ট ও অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি-জেনারেল ফর বাংলাদেশ।
আপনার মতামত লিখুন : :