ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯১৫ সালের ১০ জানুয়ারি বৃন্দাবন সাহা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। একাডেমী শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শারিরিক এবং মানসিক বিকাশে বিদ্যালয়টি বেশ সক্রিয়। এই বিদ্যালয় থেকে দেশবরেণ্য অগণিত কৃতি সন্তানের জন্ম হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বলতে গেলে গত ১০-১২ বছর যাবত প্রতিষ্ঠানটির পড়াশুনার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া স্কুলের আয় ব্যয়, নানাবিধ অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে স্কুলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আর এসবের জন্য স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুর মোহাম্মদ জমাদ্দারকে দায়ি করছেন এলাকাবাসী। শুধু তাই নয়, তার পদত্যাগ চেয়ে মানববন্ধনও করেছে। তাছাড়া সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগসহ মামলার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে সবকিছু মিলে ঐতিহ্যবাহী রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয় নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইয়ে যাচ্ছে।
নুর মোহাম্মদ জমাদ্দার ২০০২ সালের ১ অক্টোবর রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। শুরুর দিকে তার আচার আচরণ, ব্যবহার ও পাঠদান বেশ সন্তোষজনক ছিল। তিনি বাঞ্ছারামপুর বার্তা পত্রিকার পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের পুরস্কারও পেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারেননি। একসময় নিজের নানাবিধ অপকর্ম ধামাচাপা দিতে সাবেক এমপি ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলামের সাহচর্যে আসেন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। যদিও তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় পদে ছিলেন না। স্কুলের পাঠদানের চেয়ে ক্যাপ্টেন তাজের চাটুকারিতা এবং তার ভাগিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জনি চেয়ারম্যানের তোষামোদীতেই ব্যস্ত থাকতেন। ফলে সুযোগের সদ্ব্যবহারে তিনি ধরাকে সরাজ্ঞান করতেন এবং বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লুটপাটে জড়িয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে তাকে পুরোপুরি সহযোগিতা করেছিলেন বাঞ্ছারামপুরের সাবেক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম ফারুক।
রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সাবেক সভাপতি মো. রাশেদুল হক স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুর মোহাম্মদ জমাদ্দারের নানাবিধ অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দাখিল করেন। শুধু তাই, ১ কোটি ১৬ লাখ ৬৯ হাজার ৮শত ৩৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, নুর মোহাম্মদ জমাদ্দার রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মাসিক বেতন, পরীক্ষার ফি, রেজিস্ট্রেশন ফি, ফরম ফিলাপ এবং প্রশংসা পত্র বিতরণের আয়ের টাকাও লুটপাট করেন।
২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত বিদ্যালয়ের হিসাব বিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ৩ কোটি ৫২ লাখ ৯৫ হাজার ৩শত ৪৭ টাকায় আয় করে, কিন্তু বিদ্যালয় পরিচালিত ব্যাংক হিসাবে (হিসাব নম্বর ১৪১৯১০০০০০১৭৭, সোনালী ব্যাংক পিএলসি, রূপসদী বাজার শাখা) ২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৫ হাজার ৫শত ৮টাকা জমা হয়। অর্থাৎ ১ কোটি ১৬ লাখ ৫৯ হাজার ৮শত ৩৯ টাকা স্কুলের ব্যাংক হিসেবে জমা হয়নি। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিল ভাউচার, ক্যাশ বই পর্যালোচনা করে দেখা যায় ২ কোটি ২১ লাখ ৮৮ হাজার ৯শত ৭৩টাকা খরচ করেন। অবশিষ্ট অর্থ ১ কোটি ৩১ লাখ ৬ হাজার ৩শত ৭৪টাকার কোন হিসাব নেই।
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা, ২০২৪ এর ৫০(৩) ধারা মোতাবেক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তহবিলে সকল আয় ব্যয় ব্যাংক হিসেবে জমা করতে হবে। এছাড়া সকল দায় একাউন্ট পেয়ি চেক মারফতে পরিশোধ করতে হবে। কোনক্রমেই নগদ অর্থ ব্যাংকে জমা না করে নগদ ব্যয় করা যাবে না।
রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়ের নানাবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতি কারণে প্রধান শিক্ষক নুর মোহাম্মদ জমাদ্দারের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর অর্থ অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ এনে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়। প্রধান শিক্ষক নুর মোহাম্মদ জমাদ্দার ওই বছরের ৮ অক্টোবর নোটিশের জবাব দেন। ম্যানেজিং কমিটির কাছে নোটিশের জবাব সন্তোষজনক মনে হয়নি। তাছাড়া ২০২০ সালের ৯ জুলাই বিধিবহির্ভূতভাবে বিদ্যালয়ের পক্ষে স্থানীয় ব্যাংক হতে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করায় ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর (বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা, ২০২৪ এর ৫৩ ও ৫৪ ধারা মোতাবেক) সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মধ্যে একটি প্রাচীন বিদ্যাপীঠ রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়। এই প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এপিও নীতিমালা ২০২১ অনুসারে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন ভাতা প্রদান করা হয়। জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৫ মোতাবেক কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীগণ মূল বেতন পান যা সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে সরকার পরিশোধ করে। বিধি মোতাবেক পিএফ হিসেবে মূল বেতনের ১০ শতাংশ কর্তন করা হয়। পাশাপাশি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিদ্যালয় ১০ শতাংশ প্রভিডেন্ট ফান্ড প্রদান করে। নুর মোহাম্মদ জমাদ্দার ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয় পরিচালিত ব্যাংক হিসাব হতে বেতনের সাথে পিএফ এর অর্থ উত্তোলন করেন কিন্তু বেতন বিলি বণ্টন করলেও নানা কৌশলে প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ শিক্ষকদের মাঝে বিলি বণ্টন না করে আত্মসাৎ করেন, এমন অভিযোগও উঠেছে। এখানেই শেষ নয়। নুর মোহাম্মদ জমাদ্দার একই সময়ে বিদ্যালয়ের অর্জিত অর্থ নগদ অর্থ হতে বিদ্যালয়ের অংশে বর্ণিত পিএফ বিলি বন্টন করে। অর্থাৎ অর্জিত নগদ তহবিল হতে পিএফ এর অর্থ বিলি করলেও বিদ্যালয়ের পরিচালিত ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা ডেবিট করে আত্মসাৎ করেন। স্কুলের ক্যাশ বই পর্যালোচনা করে দেখা যায় ২০২০ সালের ২ জানুয়ারি শিক্ষকের পিএফ বিতরণের অংশ হিসেবে জুলাই-আগস্ট দুই মাসের বিতরণ করা হয় ৫৭ হাজার ৬শত ৪৮ টাকা, কিন্তু ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর এই দুই মাসে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮শত ৬৯ টাকা। পাশাপাশি ২০২০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে পিএফ হিসেবে ২০২১ সালের ৮ এপ্রিল পরিশোধ করেন ৬৪ হাজার ৪শত ৮৪ টাকা। পিএফ পরিশোধ বিশ্লেষণে স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে, প্রধান শিক্ষক নুর মোহাম্মদ জমাদ্দার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অংশ ক্যাশ বইতে খরচ হিসেবে নামেমাত্র উল্লেখ করে বাকি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের প্রাপ্ত পিএফ যথাসময়ে ব্যাংক থেকে নগদ উত্তোলনপূর্বক পরিশোধ করা হলেও ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারিতে শিক্ষকদেরকে ২০১৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সময়ের ১০ লাখ ৪৮ হাজার ১শত ৩০ টাকা পরিশোধের নামে আত্মসাৎ করেছেন।
রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয় বাঞ্ছারামপুর-নবীনগরসহ পাশ্ববর্তী এলাকার মধ্যে একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ। অথচ এই বিদ্যালয়ের সমস্ত অর্জন ম্লান করেছেন নুর মোহাম্মদ জমাদ্দার। তিনি মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, বাঞ্ছারামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের অনুমতি না নিয়েই ২০১৫ সাল থেকে কিন্ডারগার্টেন পরিচালনা করে আসছেন। ফলে বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়ে সময় দিতে পারেন না। বাড়তি আয়ের লক্ষ্যেই তিনি কিন্ডারগার্টেন পরিচালনা করে আসছেন।
প্রধান শিক্ষক নুর মোহাম্মদ জমাদ্দার শুধু বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়ের আর্থিক দুর্নীতি করেই ক্ষান্ত হননি। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই তিনি ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর তার স্ত্রী মাহমুদা বেগমকে বিদ্যালয়ে যোগদান করান। অভিযোগ রয়েছে তখনকার সময়ে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাকে ম্যানেজ করে বিধি বহিঃর্ভূতভাবে নিজের স্ত্রীকে ব্যবসা শিক্ষার সহকারি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন।
নানাভাবে বিতর্কিত নুর মোহাম্মদ জমাদ্দার বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবকে ব্যক্তিগত কাজেও ব্যবহার করেছেন। স্কুলের ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে ২০১৭ সালের ২০ জুনে নরসিংদী থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ওই একই বছরের ২১ জুন একই স্থান থেকে ৯ লাখ টাকা জমা করা হয়। কিন্তু নরসিংদী শহরে এই বিদ্যালয়ের কোন আয়ের উৎস নেই। অর্থাৎ প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অর্থ উত্তোলনপূর্বক এই একাউন্টের অপব্যবহারের মাধ্যমেও দুর্নীতি করেছেন।
রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়ের রেজুলেশন হতে এই বিদ্যালয়ে আজীবন দাতা সদস্য হতে এককালিন ২ লাখ টাকা বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসেবে জমা প্রদান করার বিধান রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে স্থায়ী দাতা সদস্য সংখ্যা ১৮ জন। সেই হিসেবে এই বিদ্যালয়কে ইতোপূর্বে এককালিন ৩৬ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে এই টাকার কোন হদিস নেই। বিদ্যালয়ের ক্যাশ বই কিংবা ব্যাংকে কোথাও ৩৬ লাখ টাকার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সচেতনমহল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর মোহাম্মদ জমাদ্দারের ব্যাপারে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন : :