• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Bancharampur Barta
Bongosoft Ltd.
ফলোআপ:

জাল সনদে ১৩ বছর চাকরি করেছেন প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজা!


বাঞ্ছারামপুর বার্তা | মনিরুজ্জামান পামেন মে ১৫, ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম জাল সনদে ১৩ বছর চাকরি করেছেন প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজা!

প্রধান শিক্ষক পদে জাল অভিজ্ঞতার সনদে তিনি চাকরি করছেন ১৩ বছর ধরে। কোন নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কখনও চাকরি করেননি, কিন্তু তিন বছরের অভিজ্ঞতা সনদ দিয়েছেন চাকরির আবেদনে সেটাও জাল। স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি এই নামে কোন শিক্ষক তাদের বিদ্যালয়ে চাকরি করেননি। জাল সনদ দিয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ১৩ বছর ধরে বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার চর শিবপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজা। শিক্ষকমহলে এমন অভিযোগ উঠেছে।  


তিনি ২০০৮ সালের ১০ জানুয়ারি সহকারি শিক্ষক হিসেবে বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মধ্য সোনারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ওই সময় বাঞ্ছারামপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ছিলেন হুমায়ুন কবীর। তার সময়েই প্রধান শিক্ষকের শুন্য পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০০৯ সালে প্রধান শিক্ষক হওয়ার নিমিত্তে আবেদন করেন সেলিম রেজা। ২০১১ সালে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন তিনি। যদিও তার চাকরিতে যোগদান এবং আবেদনের সময়কাল পর্যন্ত মাত্র ১ বছর পূর্ণ হয়। সরকারি বিধি মোতাবেক প্রধান শিক্ষক হওয়ার জন্য ন্যূনতম এমএ পাশ হতে হবে অথবা শিক্ষা ক্ষেত্রে ৩ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। যার কোনটাই ছিল না সেলিম রেজার। পরে তিনি প্রতারণার আশ্রয় নেন। কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলার দুলালপুর গ্রামের আমিরুল ইসলাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের চাকরি করেছেন এই মর্মে অভিজ্ঞতা সনদ দেখান বলে অভিযোগ উঠে। তবে ওই স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি সেলিম রেজা নামে কোন শিক্ষক এখানে কখনও শিক্ষকতা করেননি। 


সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় প্রধান শিক্ষক নিয়োগ কমিটির সভাপতি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক ও সদস্য সচিব জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হযরত আলী। ওই সময় বাঞ্ছারামপুর উপজেলা থেকে ৩ জনকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এদের মধ্যে প্রতারণা আশ্রয় নিয়েছিলেন সেলিম রেজা ও মায়রামপুরের তাহমিনা আক্তার। তখন যোগ্য প্রার্থী না থাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের একজনকে ৭/ক ধারা মোতাবেক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওই শিক্ষক রাজশাহী চলে যান এবং তাহমিনা বেগম ঢাকায়। বিতর্কিত ওই নিয়োগ নিয়ে পুরো উপজেলায় তোলপাড় শুরু হয়েছিল। মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন সেলিম রেজা এবং তাহমিনা বেগম।


কথা হয় হোমনা উপজেলার দুলালপুর আমিরুল ইসলাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতিকুর রহমানের সাথে। তিনি জানান, সেলিম রেজা নামে কেউ কখনও ওই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন না। তাছাড়া ২০১১ সাল থেকে ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। তার পূর্বে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন মফিজুল ইসলাম। রেজিষ্ট্রার খাতা চেক করে ওই সময়ও সেলিম রেজা নামে কোন শিক্ষকের নাম পাওয়া যায়নি।


হোমনার দুলালপুর আমিরুল ইসলাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম জানান, আমি প্রতিষ্ঠাকালীন ২০০৩ সাল থেকে বিদ্যালয়ে আছি। সেলিম রেজা নামে কোন শিক্ষক এখানে শিক্ষকতা করেননি। যদি তিনি অভিজ্ঞতা সনদ দিয়ে থাকেন সেটা অবশ্যই জাল।


বাঞ্ছারামপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর চলে যাওয়ার পর ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হন মো. কবির হোসেন। তিনি সেলিম রেজার জাল সনদের বিষয়ে স্থানীয় কিছু অভিযোগ পেয়ে সরেজমিনে তদন্ত শুরু করেন। একপর্যায়ে আমিরুল ইসলাম বালিকা বিদ্যালয়ে গিয়ে জাল সনদের বিষয়টি সত্যতা পান। পরে তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হযরত আলীর কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেন। কিন্তু তৎকালীন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও কিছু আওয়ামী লীগের নেতার চাপে কবির হোসেন সেলিম রেজাকে যোগদান করাতে বাধ্য হন। 


পরবর্তীতে তিনি সেলিম রেজার বিষয়ে পুলিশ তদন্তের জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে আরেকটি চিঠি দেন। কিন্তু ওই চিঠি আর আলোর মুখ দেখেনি। আর তখন থেকেই বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন সেলিম রেজা।
বাঞ্ছারামপুরের সাবেক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, সেলিম রেজা ২০১১ সালে যোগদান করতে আসলে তার বিষয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি আমার কাছে অভিযোগ করে। তখন আমি বিষয়টি তদন্ত করতে হোমনার ওই বিদ্যালয়ে যাই। তারা রেজিস্ট্রার খাতা দেখে আমাকে নিষেধ করে এই নামে কোন ব্যক্তি এখানে শিক্ষকতা করেননি। বিষয়টি আমি তৎকালীন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হযরত আলী স্যার কে লিখিতভাবে জানাই, কিন্তু স্যার ও কিছু শিক্ষক নেতা এবং রাজনৈতিক নেতাদের চাপের কারণে তাকে আমি যোগদান করাতে বাধ্য হই। পরবর্তীতে আমি পুলিশ তদন্তের জন্য জেলা স্যারকে আরেকটি চিঠি দেই, কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। 


নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক জানান, সেলিম রেজা প্রাথমিকে জয়েন করার পূর্বে  বসুন্ধরা গ্রুপে চাকরি করতেন। কিন্তু জাল সনদ দেখান হোমনার এক স্কুলের, যা সম্পূর্ণ আইন বিরোধী। 
এদিকে সেলিম রেজার চারিত্রিক বিষয় নিয়েও অনেক অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে বাঞ্ছারামপুর বার্তার কাছে প্রমাণও এসেছে। তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে স্কুল ফাঁকি দিয়ে নিয়মিত উপজেলা সদরের বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা দেন। তাছাড়া তিনি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে মিলে বদলি বাণিজ্য ও বিভিন্ন মালামাল সরবরাহ সহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথেও জড়িত। সঠিক তদন্তে সবই বেরিয়ে আসবে।


ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতা আওয়ামী লীগের আমলে সমস্ত সুযোগ সুবিধা ভোগ করার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাতারাতি বদলে যান। নিজেকে বিএনপি পরিবারের দাবি করে কর্মক্ষেত্রে ফাঁকিসহ নানা অনৈতিক সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছেন। বিগত সময়ে সাবেক এমপি ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম ও তার ভাগিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী জাদিদ আল রহমান জনির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। তারপর থেকেই তিনি ধরাকে সরাজ্ঞান করতেন।   


সেলিম রেজার প্রতারণার বিষয়ে কথা বলার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামসুর রহমানকে মোবাইলে ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। 
এদিকে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল আজিজকে জানানো হলেও তিনি কোন মন্তব্য করেননি।
অভিযোগ রয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ও বাঞ্ছারামপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই বছরের পর বছর ধরে বহাল তবিয়তে আছেন তিনি। উপজেলার সচেতনমহল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী, সচিব, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচলকসহ সরকারের উধ্বর্তন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। 

Side banner 1 Side banner 2