২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে পতন ঘটে দীর্ঘ ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের। সরকার পতনের পরপরই দলের নীতি-নির্ধারক ও প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় সারির সাবেক মন্ত্রী ও এমপিদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক হত্যা ও সহিংসতার মামলা হয়েছে। বর্তমানে কারাগারে থাকা হত্যা ও সহিংসতা মামলার আসামি প্রায় এক ডজন সাবেক মন্ত্রী-এমপি এখন জামিনের আশায় উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। নিম্ন আদালতে জামিন পেতে ব্যর্থ হয়ে তারা হাইকোর্টে আবেদন করেছেন। এরই মধ্যে কেউ কেউ জামিন প্রশ্নে রুল পেয়েছেন, আবার কারও কারও আবেদনের শুনানি শেষে আদেশের জন্য দিন ধার্য রাখা হয়েছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, একাধিক হত্যা ও সহিংসতা মামলায় কারাগারে থাকা দলটির প্রায় এক ডজন প্রভাবশালী সাবেক মন্ত্রী-এমপি এখন উচ্চ আদালতে জামিনের লড়াই চালাচ্ছেন। এই তালিকায় রয়েছেন— সাবেক রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, সাবেক এমপি আবদুল্লাহ আল জ্যাকব, সাবেক এমপি ও সংগীতশিল্পী মমতাজ বেগম এবং সাবেক এমপি ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনসহ আরও অনেকে। এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, সাবেক এমপি আবদুল্লাহ আল জ্যাকব, সাবেক এমপি ও সংগীতশিল্পী মমতাজ বেগম এবং সাবেক এমপি ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনসহ আরও অনেকে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আইনের ফাঁক-ফোকর গলে প্রকৃত অপরাধীরা যেন জামিন পেয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে, সে বিষয়ে তারা অত্যন্ত সতর্ক রয়েছেন।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আলামিন ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বিগত ১৭ বছরে বিএনপি-জামায়াতসহ সাধারণ মানুষের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার করেছে। ৫ আগস্টের পর জুলাই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এই সাবেক মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো করা হয়েছে। ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলি চালানোর ঘটনায় আওয়ামী লীগের এই এমপি-মন্ত্রীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরাসরি জড়িত ছিলেন। তারাই ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও তাদের ক্যাডারদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আদালতে জামিন পাওয়ার মতো পর্যাপ্ত যুক্তি (গ্রাউন্ডস) তারা এখনও উপস্থাপন করতে পারেননি। প্রতিটি মামলায় তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। আমরা মনে করছি, এই মুহূর্তে যদি তারা জামিন পান, তবে দেশে এখন যে স্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে, তা হুমকির মুখে পড়বে। তাই রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আমরা জোরালো ভূমিকা পালন করছি, যাতে কোনোভাবেই তাদের জামিন না হয় এবং এর স্বপক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তি আমরা আদালতে উপস্থাপন করছি।’
সরকার পতনের পরপরই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় সারির নেতাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার অভিযোগে সাধারণ আদালতে মামলা চলছে। নিম্ন আদালতে জামিন না পেয়ে এই নেতারা উচ্চ আদালতে শরণাপন্ন হয়েছেন। কেউ কেউ রুল পেয়েছেন, আবার কারও আবেদনের আদেশ ৫ মের জন্য ধার্য রাখা হয়েছে
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগসহ তিনটি মামলায় হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেছেন সাবেক রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। বিচারপতি জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি শেষে আগামী ৫ মে এই মামলাগুলোতে আদেশের জন্য দিন ধার্য রেখেছেন।
এর আগে, ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রফিকুল ইসলাম হত্যা মামলায় নুরুল ইসলাম সুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে ২২ সেপ্টেম্বর আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন এবং ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। গত ২৮ আগস্ট রফিকুল ইসলামের স্ত্রী নাজিয়া আক্তার বাদী হয়ে শেখ হাসিনাসহ ১৯৫ জনকে আসামি করে এই মামলা দায়ের করেন। এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ বিশেষায়িত হাসপাতাল থেকে সুজনকে আটক করেছিল পুলিশ।
সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেছেন, যা হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর বেইলি রোড থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর মিরপুর থানার একটি হত্যা মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মোশাররফ হোসেন।
গত ১৮ জুলাই মিরপুর এলাকায় সিয়াম সরদার (১৭) নামের এক কিশোর হত্যার ঘটনায় তার বাবা সোহাগ সরদার বাদী হয়ে ১২ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনাসহ ১১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন, যেখানে আসাদুজ্জামান নূরের নামও রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা রয়েছে।
আদালতে জামিন পাওয়ার মতো পর্যাপ্ত যুক্তি (গ্রাউন্ডস) তারা এখনও উপস্থাপন করতে পারেননি। প্রতিটি মামলায় তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। আমরা মনে করছি, এই মুহূর্তে যদি তারা জামিন পান, তবে দেশে এখন যে স্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে, তা হুমকির মুখে পড়বে। তাই রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আমরা জোরালো ভূমিকা পালন করছি, যাতে কোনোভাবেই তাদের জামিন না হয় এবং এর স্বপক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তি আমরা আদালতে উপস্থাপন করছি
বিএনপি কর্মী মকবুলকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীকে কেন জামিন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। গত ২৮ এপ্রিল হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ এই রুল জারি করেন।
২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর রাতে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১ নভেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেরা মাহবুব এ মামলায় তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ৬ নভেম্বর আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন প্রধান হারুন-অর রশীদ, পুলিশ কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ও বিপ্লব কুমারের নেতৃত্বে বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। এরপর সেখানে ভাঙচুর করা হয়। কার্যালয়ের পাশে থাকা নেতাকর্মীদের ওপরও হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনায় মামলাটি করা হয়।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ৩০ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) হাইকোর্টে দুটি মামলায় জামিন পেয়েছেন। এদিকে, পাঁচটি মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের বিষয়ে রোববার (৩ মে) আদেশ দেবেন আপিল বিভাগ।
আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই দিন ধার্য করেছেন। উল্লেখ্য, গত বছরের ৯ মে ভোররাতে শহরের দেওভোগ এলাকার ‘চুনকা কুটির’ থেকে আইভীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজধানীর রূপনগর থানা এলাকায় শামীম হাওলাদারকে গুলি করে হত্যার মামলায় হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেছেন ভোলা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল জ্যাকব। তার জামিন আবেদন হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে শুনানির জন্য রয়েছে।
২০২৪ সালের ১ অক্টোবর গুলশান থেকে গ্রেপ্তারের পর একাধিক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে ২৬ নভেম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠান। শামীম হাওলাদার গত ২০ জুলাই রূপনগরে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার চাচাতো ভাই সম্রাট হাওলাদার রূপনগর থানায় হত্যা মামলা করেন, যেখানে জ্যাকব এজাহারনামীয় ১২২ নম্বর আসামি।
রাজধানীর মিরপুর থানায় দায়ের করা সাগর হত্যা মামলায় সাবেক এমপি মমতাজ বেগমকে কেন জামিন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। এছাড়া, তার আরও তিনটি মামলা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
২০২৫ সালের ১২ মে ধানমন্ডি থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ১৭ মে রিমান্ড শেষে মানিকগঞ্জ-২ আসনের এই সাবেক সংসদ সদস্য ও সংগীতশিল্পীকে কারাগারে পাঠানো হয়। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর খিলগাঁও ও আদাবর থানার পৃথক দুটি হত্যা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের জামিন প্রশ্নে জারি করা রুল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এর আগে জানতে চেয়েছিলেন কেন তাকে জামিন দেওয়া হবে না।
বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান ও বিচারপতি ও বিচারপতি কাজী ইবাদত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। এছাড়া সাবেক প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু এবং সাবেক এমপি তানভীর ইমামের জামিন আবেদনও হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন : :