• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩
Bancharampur Barta
Bongosoft Ltd.

হযরত রাহাত আলী শাহ (রহ:)


বাঞ্ছারামপুর বার্তা | আরিফ মজুমদার এপ্রিল ১২, ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম হযরত রাহাত আলী শাহ (রহ:)

যুগে যুগে বাংলাদেশে আগমন ঘটেছে বহু সাধকের। এদেশেও জন্ম গ্রহণ করেছেন অনেক সাধক এবং আওলীয়া। যাদের পূণ্য পদচারণায় গর্বিত এ বাংলাদেশ। তাদের একজন হযরত রাহাত আলী শাহ্ (রহ:)। 
হযরত রাহাত আলী শাহ্ (রহ:) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মধ্যনগর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা আইন উদ্দিন মোল্লা এবং মা আয়না বিবি। দাদা মোহাম্মদ হানিফ বেপারী।
রাহাত আলী শাহের প্রকৃত নাম আবদুল আলীম। রাহাত আলী ছিল ডাক নাম। দু’ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। বড় ভাইয়ের নাম রহমত আলী।
শীতের শেষে বসন্ত আসি আসি করছে। ঠিক এমনি সময়ে এক রাত্রি শেষে পূর্ব দিগন্ত ফর্সা হয়ে ক্রমশ: রক্তিম বর্ণ ধারণ করতে যাচ্ছে। যাকে বলে সুবেহ সাদেক। এমনি সময় মধ্যনগর গ্রামের আইন উদ্দিনের স্ত্রী প্রসব ব্যথায় খানিকটা কঁকিয়ে উঠলেন। চারদিক থেকে সমস্বরে মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আজানের মধুর “আল্লাহু আকবর” ধ্বনি। ঠিক সে সময়ে ঘর আলো করে এক টুকরো নুরের আলোর মত জন্ম নিলেন রাহাত আলী শাহ্। সন্তানের রূপে মুগ্ধ হয়ে মা ভুলে গেলেন নয় মাস দশ দিনের কষ্ট ভোগ এবং প্রসব যন্ত্রনা। আইনউদ্দিন মোল্লা যথানিয়মে দ্বিতীয় পুত্রের আকিকা করে নাম রাখলেন আবদুল আলীম (রাহাত আলী)। মা রাহাত আলী নামেই বেশী ডাকতেন। 
অপরিসীম স্নেহ, মায়া মমতা নিয়ে পিতা-মাতা এবং পিতৃব্যদের আদরে সোহাগে বড় হতে থাকে শিশু রাহাত আলী। শৈশব থেকেই তার মধ্যে ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। 
যে দেখে সেই মুগ্ধ হয়ে যায়। কোন কান্নাকাটি নেই। 
যে হাত বাড়ায় তার কোলেই লাফিয়ে পড়ে। 
যে কেউ তাকে কোলে নিয়ে অনুভব করেন এক স্বর্গীয় শান্তি। 
শৈশব পেরিয়ে হাটি হাটি পা পা করে এগিয়ে যায় বাল্যের দিকে। সংগী জুটে যায় আরও ক’জন বালক। তাদের সাথে খেলতে যায়, বেড়াতে যায় কিন্তু কি যেন একটা অনুভূতি তাকে উদাস করে রাখে। খেলতে যেয়ে হয়তো প্রকৃতির মধ্যে কিছু একটা খুজে বেড়ায়, উদাস উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তারপর হয়তো এক সাথীর ডাকে তার সম্বিত (attention) ফিরে আসে। ছেলের এহেন মনোভাব পিতামাতার মনেও ভাবান্তর এনে দেয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয় রাহাত আলীকে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন বলে। 
কথা বলতে শেখার পর থেকেই বাবা মায়ের কাছেই শুরু হয় রাহাত আলীর আরবী শিক্ষা। খুব অল্প দিনের মধ্যেই সে কালেমা সহ বেশকিছু সুরা মুখস্ত করে ফেলে। তারপর নিজ থেকেই বাবা মায়ের সাথে দেখাদেখি নামাজ পড়তে শুরু করে। 
মক্তবে ভর্তি করানো হয় তাকে। 
কিছু দিনের মধ্যে সে কায়দা-সিপারা (আমপারা) শেষ করে কোরআনের সবক নেয়। পড়াশুনায় গভীর উৎসাহ দেখে মক্তবের শিক্ষকরা তার প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়।
তার মায়াবী মিষ্টি চেহারা এবং আচার ব্যবহার ছিল অসাধারণ। শিক্ষকরা মনে করতে থাকেন, এ ছেলে ভবিষ্যতে বড় আলেম হবে। তাই শিক্ষকরাও তার প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে থাকে। মক্তবের শিক্ষার পাশাপাশি রাহাত নিজে কোরআন হেফজ করার চেষ্ট চালাতে থাকে এবং কুরআনের কিছু অংশ হেফজ (মুখস্থ)করে নেয়। মক্তবে পড়া শেষ হলে নাসিরনগর মাদ্রাসায় পড়তে পাঠানো হয়। পরে ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় রাহাত আলী উঁচ্চ শিক্ষা নিতে যায়।
কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার পীর কাশিমপুর গ্রামের হযরত নাজিমুদ্দিন চিশতী (রহ.) তাঁর সহপাঠী ছিল। তিনি একদিন বলেছেন, “মাদ্রাসা ছাত্র থাকাকালীন সময়ে রাহাতের মধ্যে তিনি অলৌকিক কার্যক্রম দেখতে পান। রাহাত সময়মতো ক্লাসে যেতেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই দেখতে পেতেন রাহাতের বসার স্থানটি শূন্য! 
টেবিলে কেবল বইখাতা পড়ে আছে। কিন্তু শিক্ষক ও ছাত্ররা এ ঘটনা টের পেত না। অন্য এক সূত্রে জানা যায়, এ সময়ে অলৌকিকভাবে রাহাত পাকিস্তানের এক মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করতেন। 
রাহাত যখন জামাতে উলার ছাত্র ঠিক সে সময় যে লজিং বাড়িতে তিনি থাকতেন এবং সে সময়ই তাঁর অলৌকিক রূপটি প্রকাশ পেয়ে যায়। একদা এক লজিং মাস্টার অমাবস্যার রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঘর থেকে বের হয়ে দেখতে পান, আকাশ থেকে একটি নূরের বিশাল রশ্মি যেন রাহাতের ঘরটিকে আলোকিত করে রেখেছে। আকাশ এবং মাটির মধ্যে তৈরি হয়েছে নুরের পথ। আর রাহাত জিকিরত অবস্থায় সেই জ্যোতির্ময় ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। লজিং মাস্টার ঘরে প্রবেশ করতেই আলো নিভে যায় এবং রাহাতও সেখান থেকে উধাও হয়ে যান। এরপর প্রায় এক যুগ লোকালয়ে তাকে দেখা যায়নি। 
বাল্যকাল থেকে মাজনুন হালত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত কেউ তাকে এক ওয়াক্ত নামাজও কাযা করতে দেখেনি। যৌবনে তিনি ছিলেন বেশ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। দেহ ছিল মার্জিত-বলিষ্ঠ ও দোহারা গড়নের। উচ্চতা ছিল প্রায় ছ’ফুটের মতো। গায়ের রং ছিল কাচা হলুদের মতো উজ্জ্বল। উন্নত নাক। বুকে, পিঠে ও হাতে বড় পশম। গাল ভর্তি দাড়ি। বার্ধক্যে তার আধা পাকা চুল আর দাড়ি ছিল ধবধবে সাদা। 
রাহাত আলী শাহের সঠিক জন্ম তারিখ জানা যায়নি। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে ওফাতের সময় তার বয়স ছিল ৮০ কিংবা ৮২। মৃত্যুর তারিখ অনুযায়ী তার জন্ম সম্ভবত ১৮৬২-১৮৬৩ সন (বাংলা ১২৭২ সালে) জানুয়ারী কিংবা ফেব্রুয়ারি। তিনি ২ আগস্ট ১৯৪৫ সনে ইহধাম ত্যাগ করেন॥
পাদটীকাঃ সাধক রাহাত আলী শাহ আমার নানার পূর্ব পুরুষ। তিনি আমার প্রমাতামহীর (নানা ভাইয়ের মায়ের) চাচা। তাদের পূর্বপুরুষ ধর্ম প্রচারে ইরান থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। মাজনুন হয়ে যাবার কারণে রাহাত আলীর বিয়ে হয়নি। 
মহান আল্লাহ, এ সাধক পুরুষকে জান্নাত নসীব করুন।
তার মাজার শরীফের পাশে ‘শাহ রাহাত আলী কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আরিফ মজুমদার

Side banner