• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল, ২০২৬, ২৬ চৈত্র ১৪৩২
Bancharampur Barta
Bongosoft Ltd.

বাঞ্ছারামপুর বিএনপিতে এগিয়ে হাইব্রিডরা, কোণঠাসা ত্যাগীরা


বাঞ্ছারামপুর বার্তা | স্টাফ রিপোর্টার এপ্রিল ৮, ২০২৬, ০৭:২২ পিএম বাঞ্ছারামপুর বিএনপিতে এগিয়ে হাইব্রিডরা, কোণঠাসা ত্যাগীরা

প্রায় দেড় যুগ ধরে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সফলতা পায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দুঃশাসনের সময় মামলার শিকার হন লাখ লাখ নেতাকর্মী। গুম-খুনের শিকার হন অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু নেতা ছিলেন একেবারেই নিষ্ক্রিয়। কেউ করেছেন আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য আবার অনেকে দীর্ঘদিন ছিলেন বিদেশে। এসব সুবিধাভোগী হাইব্রিড নেতা এখন বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন এলাকা। থাকছেন বিএনপির মিছিল-মিটিংয়ের একেবারে সামনের সারিতে। তাদের দৌরাত্ম্যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ত্যাগ স্বীকার করা নেতাকর্মীরা।


বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ। আওয়ামী লীগের শাসনামলে তিনি ছিলেন নানাভাবে নির্যাতিত। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতাই গা ঢাকা দেন। অনেকে রাজধানী ঢাকায় বসে আওয়ামী লীগের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন এবং ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করেন। দলের ওই কঠিন সময় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ান কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ। 


২০০৯ সালের শুরুর দিকে বাঞ্ছারামপুর উপজেলার দুর্গারামপুর গ্রামের রুহুল আমিন সরকার রাজিব, আইয়ুবপুর গ্রামের আজিজুল হক খোকা, সাইদুর রহমান, বাহেরচর গ্রামের তাহের হোসেন, শরীফুল ইসলাম, ডালিম, ইমরান, বাহেরচরের আবুল আইয়ুম, দশানীর আলহাজ¦ মো. সেলিম আক্তার, কানাইনগরের তরিকুল ইসলাম, সোনারামপুরের হাফেজ রফিক, এনামুল হক, রাধানগর গ্রামের প্রফেসর শামিম, সাইফুল ইসলাম নয়ন, রকিব উদ্দিন, কালিকাপুরের আবুল হোসেনদের সাথে নিয়ে পথচলা শুরু হয়। এরই মধ্যে যোগ হয় বাঁশগাড়ির মান্নান মেম্বারের ছেলে মনির হোসেন, মাস্টারবাড়ির আবদুল্লাহ আল মামুন। ওই সময় মামলা মোকদ্দমা, ভয়ভীতি উপেক্ষা করে রাজধানী ঢাকা ও বাঞ্ছারামপুরে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যান কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ।


২০১১-১২ সালের শুরুর দিকে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র নেতাদের দোয়া আশীর্বাদ ও সাপোর্ট পান কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ। এদের মধ্যে মরহুম কর্ণেল নূর মোহাম্মদ, মরহুম ভিপি আব্দুল মান্নান, খোষকান্দির মরহুম শহীদ চেয়ারম্যান, মাহবুব হাসান বাবু চেয়ারম্যান, ফরদাবাদের বোরহান আহমেদ, ডাক্তার রফিকুল ইসলাম খোকন, শামীম শিবলী প্রমুখ ব্যক্তিদের সাথে নিয়ে ঝিমিয়ে পড়া দলকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আরও জোড়ালোভাবে মাঠে নেমে পড়েন কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ।


এরই মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ডক্টর খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মির্জা আব্বাস, আবদুল্লাহ আল নোমান, রিজভী আহমেদ, আসাদুজ্জামান রিপন, বরকত উল্লাহ বুলু, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও শামসুজ্জামান দুদু প্রমুখ ব্যক্তিদের নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রতিমাসে নিয়মিতভাবে আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আলোচনাসভা ও প্রতিবাদ সমাবেশ করতেন। যার পুরো অর্থ ব্যয় করতেন কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ। তখন সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন দ্বারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হন। তারপরও তিনি থেমে থাকেননি। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, ২০০৯ সালের পর থেকে অদ্যাবধি বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপিকে শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।


২০১৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় নির্বাচনের পর বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। মামলা-হামলা, ভয়ভীতিসহ নানা কারণেই বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দলের বেশকিছু সিনিয়র নেতা রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করেন, অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। আর ঠিক তখনই দলকে শক্তিশালী করার জন্য লিয়াকত আলী ফরিদ, আবদুস সাত্তার সরকার, ছালে মুসা, হারুন অর রশীদ, আউলাদ মোল্লা, মাহবুব, বাহেরচরের মরহুম নাজিমউদ্দিন, সোহেল, হানিফ মিয়া, আনোয়ার হোসেন, গিয়াসউদ্দিন, কল্যাণপুরের মহিউদ্দিন, স্বপন সিকদার, আবদুল করিম চেয়ারম্যানের মতো ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেন কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ। 


এছাড়াও বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছিলেন দশদোনার ভিপি মজিবুর রহমান, এমদাদুল হক সাইদ, কবির হোসেন, বাচ্চু, রফিকুল ইসলাম সেন্টু, জুয়েল মোক্তার, সোহেল, বাবু, মোজাম্মেল হক বাবু, বাহেরচরের ভিপি নাজমুল হুদা, জগন্নাথপুরের জিসান, সজল, মানিক ভুঁইয়া, রকি, শাহাদাৎ, দুর্গারামপুরের রুবেল, সফিকুল, রাজিবুল, সাইফুল, ভিটি ঝগড়ারচর গ্রামের ওমর ফারুক, তারিকুল ইসলাম বাবু, মরহুম আলাউদ্দিন, বাঞ্ছারামপুর গ্রামের মরহুম মোশাররফ হোসেন, নাজির হোসেন, মো. হানিফ মিয়া, অপু, নাসির, আবু কালাম, সামি, ইমান আলী, জামাল, আনোয়ার হোসেন, আতাউর রহমান, বড়বাড়ির পাভেল সরকার, সালাউদ্দিন, রাজন চন্দ্র সূত্রধর, মরহুম ফাহাদ, ফতেহপুরের জিসান বিল্লাল, রূপসদী হাজী আবদুল মতিন, পলাশ, দেলোয়ার, শিপন, ওসমান মাঝি, আকরাম, জগন্নাথপুরের সজল, লিটন, রেজা, পাড়াতলির জাহাঙ্গীর, পলাশ, মোহাম্মদ আলী, জিশান, মিসন, বাঁশগাড়ির ফরিদ ডিলার, মাসুম, আলমগীর, মাস্টারবাড়ির মেহেদী, লিটন, গায়ক সুমন সিকদার, দরিয়াদৌলতের ডাক্তার মামুন, মরিচাকান্দির রবিন, সোনারামপুরের ইকবাল হোসেন, জেবাল, আলমগীর হোসেন, ফরদাবাদের সালাউদ্দিন, মিরপুরের ওছাউদ্দিন, আইয়ুবপুরের ইয়াসিন, জালাল, বিল্লাল, দুর্গাপুরের জাহাঙ্গীর, রবিউল্লাহ, সগির আহমেদ, উজানচরের সুজন, দুলারামপুরের আবুল হোসেন, দশানীর জয়নাল আবেদীন, ছলিমাবাদের আবদুস সালাম, রফিক মেম্বার, বিল্লাল হোসেন, ভুরভুরিয়ার মুসা, কদমতলির উজ্জ্বল, দরিভেলানগরের রাব্বি, আকানগরের আইনুল, খাককান্দার শাহআলম, ফারুক, চরলহনীয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম হারেস মিয়া, কদমতলির মেজবাহউদ্দিন, দরিকান্দির মোহাম্মদ আজিজ, সালাউদ্দিন, উলুকান্দির শাকিল, খোষকান্দির জাহাঙ্গীর আলম, মরহুম মনির হোসেন, রূপসদীর মুসা হায়দার, রাধানগরের মতিন, নাসির, মোয়াজ্জেম, ইমন, লিমন, সোহেল রানা, কালিকাপুরের সোহেল, বাহেরচরের ইমরান, হিরোসিম, হৃদয়, উজ্জ্বল, কাউসার, রুবেল, রিফাত, সাগর, খলিল, মনাইখালির লিটন, নগরীরচরের সালাউদ্দিন, মামুন, শিবপুরের রফিক প্রমুখ।


দলকে বাঁচাতে এবং সুসংগঠিত করতে এরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে অবস্থান করেছিলেন। এদের মধ্যে অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। আবার অনেকে দলের মধ্যে কোনঠাসা হয়ে আছেন। অনেকে এখনও মিথ্যা মামলায় হাজিরা দিচ্ছেন।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত ১৭ বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে যাদের পাওয়া যায়নি ঢাকায় আত্মগোপনে ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন নিজেদের ত্যাগী ও নির্যাতিত দাবি করে মাঠে ময়দানে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে এবং নানাবিধ অপকর্ম করে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। হাইব্রিড নেতাদের উৎপাত ও দলবিরোধী কর্মকাণ্ডে বিএনপির তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা বরাবরই ক্ষুব্ধ। 


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই জানান, আওয়ামী লীগের আমলে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির অনেক নেতাই সাবেক এমপি ক্যাপ্টেন এবি তাজুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম এবং বাঞ্ছারামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, উজানচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী জাদিদ আল রহমান জনির সাথে সখ্যতা বজায় রেখে চলতেন। অনেকে আবার আওয়ামী লীগের সাথে গোপন আঁতাত করে বিএনপির নেতাকর্মীদেরই বিপদে ফেলতেন। সংসদ ভবনে গিয়ে ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলামের রুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতেন এবং আওয়ামী লীগকে আর্থিকভাবে সহযোগিতাও করতেন। তাছাড়া ১/১১ এর পর বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীই বিদেশে পালিয়ে যান। তবে পালিয়ে যাওয়া বিএনপি নেতাদের অনেকেই আবার দলের পক্ষে কাজ করতেন এবং দলের অনেক নেতাকর্মীদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতেন। 


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতন হলে রাতারাতি হাইব্রিড বিএনপির অনুপ্রবেশ ঘটে। একই সাথে ১৬-১৭ বছর দল থেকে দূরে থাকা নেতাকর্মীরাও বাঞ্ছারামপুরে প্রবেশ করে। বিদেশে পালিয়ে যাওয়া নেতাকর্মীদের অনেকেই দেশে ফিরে আসেন। আর এসব কারণেই ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা হাইব্রিডদের ভীড়ে পিছিয়ে যায়।
গত পবিত্র ঈদুল ফিতরের সময় হাইব্রিডদের অনেকেই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলর, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বার হওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন কৌশলে নিজেদের ত্যাগী হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেন। একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকা অনেকেই এখন বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে জনপ্রতিনিধি হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার পালাবদলে এদের অনেকেই আবার গা ঢাকা দিতে পারে। ফলে সবকিছু বিবেচনা করে তৃণমূল ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নই এখন সময়ের দাবি।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা তৃণমূল বিএনপির ১৩টি ইউনিয়ন ও বাঞ্ছারামপুর পৌরসভার দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের দাবি, দল যেন আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপির চেয়ারম্যান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নীতি ও আদর্শকে বুকে ধারণ এবং লালন করা নেতাকর্মীদেরই যেন সঠিক মূল্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি হাইব্রিড নেতাদের বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখার দাবি জানান।

Side banner