কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ২৬ লাখ মার্কিন ডলারের সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে জাপান ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ইউএনএইচসিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, জাপান সরকার আজ বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং আশ্রয় নির্মাণ সামগ্রী, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচ্ছন্ন রান্নার চুলা সরবরাহের জন্য ২৬ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি এবং বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর-এর রিপ্রেজেন্টেটিভ ইভো ফ্রেইসেনের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
জাপানের উদার সহায়তায় ইউএনএইচসিআর বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরে জরুরি সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারছে, যেখানে ১১ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। মিয়ানমারে লক্ষ্যভিত্তিক নিপীড়ন ও সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার নয় বছর পরও রোহিঙ্গা পরিবারগুলো নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও টিকে থাকার জন্য ব্যাপকভাবে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
মৌসুমভিত্তিক ভারী বর্ষণ, ঝড়ো হাওয়া ও খরার ঝুঁকিতে থাকা ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোতে অধিকাংশ রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্র বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে নির্মিত, যা নিয়মিতভাবে জরুরি মেরামতের প্রয়োজন হয়। জাপানের সহায়তায় প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় মেরামত উপকরণ সরবরাহ করা হবে এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায় থেকে ৩০০ জন আশ্রয় স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ ও সম্পৃক্ত করা হবে। পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও স্বাস্থ্য পোস্টের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা হবে এবং ১৬২ জন শরণার্থীকে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে সম্পৃক্ত করা হবে। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ জীবিকাভিত্তিক সুযোগ আত্মনির্ভরশীলতা ও সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণমূলক মালিকানা বোধ জোরদার করে এবং আশার সঞ্চার করে।
ফ্রেইসেন বলেন, রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতির নবম বছরে প্রবেশের প্রাক্কালে জাপানের জনগণের ধারাবাহিক সহায়তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বৈশ্বিক সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁট জীবনরক্ষাকারী কর্মসূচিকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং অর্জিত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের উদার আতিথেয়তাপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অংশীদারিত্বে আমাদের শরণার্থীদের মর্যাদা ও কল্যাণ রক্ষা ও উন্নত করতে হবে, যতক্ষণ না মিয়ানমার প্রসঙ্গে রাজনৈতিক অগ্রগতি নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
রাষ্ট্রদূত সাইদা আশা প্রকাশ করেন, জাপান সরকারের এই সহায়তা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনমান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জরুরি সহায়তার জন্য ইউএনএইচসিআরে জাপানের অতিরিক্ত তহবিল ঘোষণা করতে পেরে আমি আনন্দিত।
তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব বাস্তব ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে জাপান অঙ্গীকারবদ্ধ।
এই অনুদানের মাধ্যমে ৩২ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারের জন্য চুলা সেটও সরবরাহ করা হবে। ইউএনএইচসিআরের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বিতরণ কার্যক্রমের পরিপূরক হিসেবে এসব চুলা পরিচ্ছন্ন রান্নার সমাধান দেবে এবং জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও ব্যবহারের ঝুঁকি দূর করবে। এতে নারী ও কিশোরীরা সুরক্ষাজনিত ঝুঁকি থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকবে এবং শিশুরা শ্রেণিকক্ষে বেশি সময় কাটাতে পারে। এলপিজি পরিবেশগত ক্ষতি রোধ করে, যা এলাকার পাহাড়ি বনভূমির পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।
বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ে ইউএনএইচসিআর ও এর অংশীদাররা রোহিঙ্গা মানবিক সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) হালনাগাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০১৭ সাল থেকে জাপান রোহিঙ্গা সংকটে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রায় ২৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা প্রদান করেছে। বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা যখন ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে, তখন টেকসই সমাধান অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত জাপানের মতো দাতাদের ধারাবাহিক ও দৃঢ় সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার মতামত লিখুন : :