ঠিকাদারের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকার ঘুষ কেলেঙ্কারির বিতর্ক রেশ না কাটতেই মানিকগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঘিরে উঠেছে নতুন ঘুষ বাণিজ্যে অভিযোগের ঢেউ। ঠিকাদারদের দাবি, এখানে বিল পরিশোধ কোনো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং নির্দিষ্ট হারে দরকষাকষির এক অলিখিত বাজার। টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না, ক্যালকুলেটরের অঙ্ক না মিললে সইও জোটে না।
অভিযোগের কেন্দ্রে নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদত হোসেন ও তার দপ্তরের কয়েকজন কর্মচারী। একাধিক ঠিকাদার একই সুরে জানিয়েছেন বিল ছাড়াতে ঘুষ দাবি, টাকা না পেলে ফাইল আটকে রাখা, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটছে।
ঠিকাদার কিতাব আলীর ছেলে রুবেলের ভাষ্য, তার বাবা মৃত্যুর আগে পৌরসভার কয়েকটি উন্নয়ন কাজ শেষ করলেও ছয় মাসেও বিল পাননি। ফাইল সংগ্রহের ধাপেই প্রতিটি কাগজ তুলতে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। পরে ১০ লাখ ১০ হাজার টাকার পাঁচটি বিল ছাড় করতে সরাসরি ১ লাখ টাকা দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত মাষ্টাররোল কর্মচারী শাকিলের মাধ্যমে দরদাম চূড়ান্ত হয় অর্ধ লক্ষ টাকায়। এর পুরো টাকা নির্বাহী প্রকৌশলীর জন্য।
নিরুপায় হয়ে রুবেল প্রথমে ২০ হাজার, পরে আরও ৩০ হাজার টাকা দেন। শাকিলকে আলাদা করে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়। একটি ফাইলে স্বাক্ষর মিললেও বাকি টাকার জন্য চাপ চলতেই থাকে। একপর্যায়ে বাকবিতণ্ডার জেরে কার্যাদেশ ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগও তোলেন তিনি। শুধু তাই নয়, তাকে পৌরসভায় ঢুকতে নিষেধ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন। সম্ভাব্য গায়েব হওয়া ঠেকাতে তিনি পাঁচটি ফাইল নিজের কাছে রেখেছেন।
একই চিত্র তুলে ধরেছেন আরেক ঠিকাদার আল রাফি। প্রায় ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকার একটি সড়ক ও ড্রেন প্রকল্পের ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হলেও প্রায় ১ কোটি টাকার বিল আটকে আছে। তার কথা, অগ্রিম টাকা ছাড়া সই হয় না। নিয়ম মেনে কাজ করেও সাইটে গিয়ে নানা অজুহাতে টাকা চাওয়া হয়। গত ২৭ নভেম্বর তিনিও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদার জানান, মোট বিলের অন্তত ৭ শতাংশ কমিশন দেওয়াই অলিখিত নিয়ম। এই টাকার ভাগ যায় প্রকৌশল বিভাগ ও হিসাব শাখায়—যার যার নির্ধারিত অংশ অনুযায়ী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে দেওয়া কাজগুলোতে এই হার ১৫ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি তাদের।
গত ১০ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ‘মানিকগঞ্জে নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘুস গ্রহণের তথ্য ফাঁস’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে এক ঠিকাদারের কাছ থেকে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় প্রান্ত নামের একটি রেস্টুরেন্টে ঘুষের ১৫ লাখ টাকা টাকা গুনে নেওয়া অভিযোগ নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে ১২ কোটি ২৬ লাখ টাকার প্রকল্পে কার্যাদেশ ইস্যু না করেই কাজ শুরুর অনুমতি ও কাজটি পাইয়ে দেওয়ার নেপথ্যে কাজ করে দেয়ার সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে নেন ১৫ লাখ টাকা ঘুষ।
অভিযোগের জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদত হোসেন বলেন, রুবেলের একটি ফাইলে কার্যাদেশই ছিল না এবং ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের কাজ হয়েছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। পুরোনো কাজের বিল না দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে বলেও জানান তিনি। ঘুষ দাবি ও কাগজ ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ অস্বীকার করে এটিকে ‘ক্ষোভ থেকে করা মিথ্যা’ বলে দাবি করেন।
পৌরসভার প্রশাসক জয়া মারীয়া পেরেয়া জানান, তিনি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করে সত্যতা যাচাই করা হবে, প্রমাণ মিললে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
অভিযোগ শুধু ঘুষে সীমাবদ্ধ নয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে উন্নয়ন কাজ নিয়ন্ত্রণের কথাও উঠে এসেছে। রাজবাড়ীর এক ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে কয়েক কোটি টাকার কাজ নিজের প্রভাববলয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
ইউআইজিপি প্রকল্পের ৪ নম্বর প্যাকেজের প্রায় ১৩ কোটি টাকার কাজ ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যেখানে ব্যক্তিগত অংশীদারিত্বের অভিযোগও রয়েছে।
নির্মাণমান নিয়েও প্রশ্ন গুরুতর। নির্ধারিত ৪১টি রডের বদলে ২৯টি ব্যবহার, সিম-১ এর জায়গায় নিম্নমানের সিম-২, মানহীন পাথর ও বালু দিয়ে কাজ—এসব অভিযোগে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্যালাসাইডিংয়ের ক্ষেত্রেও শর্ত ভেঙে বঙ্গা পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রায় ৬০০ মিটার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে, যেখানে যন্ত্র ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা ছিল।
তদারকি এড়াতে কর্মীদের সাইট থেকে সরিয়ে দেওয়া, কাজের সময় নজরদারি না থাকা, এমনকি কর্মীদের হুমকির মুখে সরে যেতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিম্নমানের প্যালাসাইডিং দেখিয়ে প্রায় ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে।
আপনার মতামত লিখুন : :