• ঢাকা
  • রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬, ১৪ চৈত্র ১৪৩২
Bancharampur Barta
Bongosoft Ltd.
‘দায়সারা’ অভিযানে পুড়ছে পরিবেশ 

চট্টগ্রামে ৮২% ইটভাটাই অবৈধ


বাঞ্ছারামপুর বার্তা | নিজস্ব প্রতিবেদক     মার্চ ২৮, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম চট্টগ্রামে ৮২% ইটভাটাই অবৈধ

চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় ইটভাটা রয়েছে ৪২৫টি, যার বেশিরভাগই অবৈধ। পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করে এসব ইটভাটার কার্যক্রম চলছে। অধিকাংশ ইটভাটার পরিবেশগত বা অবস্থানগত ছাড়পত্র নেই। বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করলেও বাজেট স্বল্পতা, জনবল সংকট ও তদারকির অভাবসহ নানা দুর্বলতার কারণে অবৈধ ভাটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না পরিবেশ অধিদপ্তর। অবৈধ এসব ইটভাটা কৃষিজমির ‘টপ সয়েল’ বা উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করছে। তাতে পরিবেশ ও খাদ্য উৎপাদনের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। উচ্চ আদালত থেকে অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।
গত ছয় মাসে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২৪টি অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এ সময়ে ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে আদায়ও হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামের মোট ৪২৫ ইটভাটার মধ্যে ৭৬টি বৈধ। এসব ভাটার পরিবেশ ও অবস্থানগত ছাড়পত্র রয়েছে। আর মোট ইটভাটার ৩৪৯টি, অর্থাৎ ৮২ শতাংশই অবৈধ।
পরিবেশ অধিপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সীমিত জনবল দিয়ে এসব অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করে জরিমানাও আদায় করা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালীরা গুঁড়িয়ে দেওয়া অবৈধ ইটভাটা পুনরায় চালু করে থাকেন।
চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ৭০টি ইটভাটা রয়েছে সাতকানিয়া উপজেলায়। এর মধ্যে ২৯টি বৈধ ও ৪১টি অবৈধ। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ৬৯টি ভাটার মধ্যে বৈধ মাত্র তিনটি, বাকি ৬৬টি ইটভাটাই অবৈধ। অপরদিকে উপজেলার হিসেবে আনোয়ারাতে সর্বনিম্ন দুটি ইটভাটা রয়েছে, যার একটি বৈধ, অপরটি অবৈধ।
অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলার উপ-পরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, ৪২৫টি ইটভাটার মধ্যে জিগজ্যাগ চিমনি ২৫২টি, ফিক্সড চিমনি ১৫৯টি, হাইব্রিড হফম্যান আটটি এবং স্বয়ংক্রিয় ইটভাটা রয়েছে ছয়টি। জেলায় যেসব ইটভাটা রয়েছে, তার বেশিরভাগই অবৈধ। এগুলো বন্ধে নিয়মিতই অভিযানে জরিমানা করা হচ্ছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর চট্টগ্রামে লাইসেন্সবিহীন সব ইটভাটা ১৫ দিনের মধ্যে বন্ধ করতে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেয় বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. হামিদুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) নামে একটি সংগঠনের করা সম্পূরক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে এ নির্দেশ আসে।
তখন জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার পক্ষে ‘কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’ দাখিল করে। পরে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি আসিফ হাসানের আদালত সকল অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তা আদালতে সুনির্দিষ্টভাবে দাখিলের নির্দেশ দেয়। আগামী ২৮ এপ্রিল পরবর্তী আদেশের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।
‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের’ পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ইটভাটা মালিকরা অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রশাসন চাইলে এসব অবৈধ ইটভাটা চলতে পারবে না।
তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসনকে আদালত ডাকলেই শুধু তারা অভিযান পরিচালনা করে থাকে। কিছুদিন বন্ধ রাখার পর আবার ইটভাটাগুলো চালু করে দেয়। কিছুদিন আগে আদালত ভেঙে দেওয়া ইটভাটার তালিকা চাইলেও সংখ্যা বলেছে, নামগুলো দেয়নি। এ কারণে আদালত সুনির্দিষ্ট নাম ঠিকানাসহ তালিকা দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেন, বাজেট স্বল্পতা, নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট না থাকাসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমরা ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছি। অভিযানে অবৈধ ইটভাটাগুলোর চিমনি ভেঙে দেওয়াসহ পুরোপুরি উচ্ছেদ করা হয়।
অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো ইটভাটাকে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ বা বন্ধ করে দেওয়া হলেও পরবর্তীতে মালিকেরা আবার সেটি নতুন করে গড়ে তুলছে, অথবা আদালত থেকে অর্ডার এনে চালু করছে।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, সাতকানিয়া ও ফটিকছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলার ফসলি জমিতে ইটভাটা করা হয়েছে। এ ছাড়া ইট তৈরির জন্য ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে, এতে করে ফসলি জমির উর্বরতা দিন দিন কমছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, যেসব জমিতে দুই ফসলি বা ততোধিকবার চাষ হয়, সেখানে ইটভাটা করার জন্য অনুমতি দেওয়া হয় না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সেটার প্রত্যয়ন করে থাকে। আমরা কখনোই সেটার ব্যত্যয় ঘটাই না।
এ কর্মকর্তা বলেন, আমাদের দেশে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আবাদি জমির পরিমাণ কমছে। জমির টপসয়েল কাটার ফলে জমির উর্বরতা শক্তি দিন দিন কমছে। ওইসব জমিতে উৎপাদনের পরিমাণও হ্রাস পাচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে সজাগ আছি।

Side banner