সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ৩ কোটি টাকার আত্মসাতের তদন্ত করতে এসে তার সঙ্গে গোপন বৈঠক, উপহার গ্রহণ ও অভিজাত হোটেলে ভূরিভোজের অভিযোগ উঠেছে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক আব্দুর রশিদের বিরুদ্ধে। সরেজমিন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন না করে এবং অভিযোগকারীর বক্তব্য না শুনেই তিনি ঢাকায় ফিরে যান।
রবিবার (২৯ মার্চ) এসংক্রান্ত কয়েকটি ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে, দুদকের দায়ের করা ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় আদালত পিআইও আবুল কালাম আজাদ, তার স্ত্রী, সন্তান ও গাড়ি চালকের স্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধের আদেশ দিলেও গত ১৫ মাসেও তা কার্যকর হয়নি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন প্রকল্পের অনুকূলে ২০২০-২১ এবং ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে শাহজাদপুরের পৌর এলাকা দ্বারিয়াপুরে মোতাহার হোসেন জনস্বার্থে ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগে করেন।
এরপর গত ২৯ মার্চ সকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (প্রশাসন) মো. আব্দুল রশীদ ওই অভিযোগের তদন্তে শাহজাদপুরে আসেন। শুরুতে তিনি অভিযুক্ত পিআইও’র নিজ কক্ষে বসে তার সঙ্গে দীর্ঘ সময় গোপন বৈঠকে ফাইলপত্র যাচাই-বাছাই করেন। এরপর গাড়িতে পিআইওকে নিয়ে তার দেখানো দুইটি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন পরিচালক আব্দুর রশিদ। যেখানে অভিযোগকারী নয়, বরং পিআইও’র ঠিক করা লোকজন আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন।
এরপর সেখান থেকে ফিরে রবীন্দ্র কাচারিবাড়ি পরিদর্শন শেষে শহরের একটি অভিজাত হোটেলে ভূরিভোজ করেন তারা। এ সময় স্থানীয় সাংবাদিকরা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তথ্য জানতে চাইলে কোনো বক্তব্য করেননি পরিচালক আব্দুর রশিদ। এরপর ব্যাগভর্তি উপহার সামগ্রী নিয়ে শাহজাদপুর ত্যাগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে অভিযোগকারী মোতাহার হোসেন বলেন, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে এলেও তদন্ত কর্মকর্তা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (প্রশাসন) মো. আব্দুল রশীদ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। পরিচালক আসার খবরে আমি তার কাছে যাই। কিন্তু সেখানে তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগ সম্পর্কে আমার কাছে কিছু শোনেননি। তিনি আমাকে ঢাকার অফিসে গিয়ে বক্তব্য দিয়ে আসতে বলেন। অন্যথায় কুরিয়ারের মাধ্যমে লিখিত বক্তব্য পাঠিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন। এ অবস্থায় তদন্ত প্রতিবেদনের ফলাফল নিয়ে শঙ্কায় আছি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক আব্দুল রশিদকে ব্যাগভর্তি উপহার সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পিআইও অফিসের স্টাফ আলতাফ হোসেন বলেন, আমরা এমনিতেই বেকায়দায় আছি। এসব বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করবেন না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক মো. আব্দুল রশিদ জানান, তদন্ত করতে ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় অভিযোগকারীকে ফোন করেছিলাম, কিন্তু তার ফোন বন্ধ ছিল। আমি হোটেলে খাওয়ার সময় অভিযোগকারী সেখানে এসেছিল। তিনি ঢাকায় এসে বক্তব্য দিতে রাজি হওয়ায় ওই সময় তার বক্তব্য নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে শাহজাদপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এর আগে পিআইও আবুল কালাম আজাদ, তার স্ত্রী, এক সন্তান ও গাড়ি চালকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পাবনা কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক সাধন চন্দ্র সূত্রধর বাদী হয়ে পৃথক ৩টি মামলা করেন। ওই মামলায় জ্ঞাত আয়বর্হিভূত ৪ কোটি ৬০ লাখ ৯৩ হাজার ২৫৮ টাকা মূল্যমানের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগ করা হয়।
২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পাবনার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক আখতারুজ্জামান তাদের স্থাবর সম্পদ ক্রোক এবং অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। ১৫ মাস অতিবাহিত হলেও আদালতের আদেশ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো অদৃশ্য কারণে কার্যকর করেনি।
পাবনা সদরের শালগাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা পিআইও আবুল কালাম আজাদ দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে সিরাজগঞ্জে কর্মরত রয়েছেন। এরমধ্যে উল্লাপাড়া উপজেলায় ৪ বছর এবং ৩ দফায় বদলি হয়ে ৯ বছর ধরে শাহজাদপুর উপজেলায় একই কর্মস্থলে রয়েছেন।
পাবনা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ে নিকট আত্মীয় ও একাধিক সচিব থাকায় দাপটে এই পিআইও’র বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।
আপনার মতামত লিখুন : :