প্রকল্পের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের জেরে দিনে-দুপুরে লোকজনের সামনে এক ইউপি সদস্যকে ‘সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে পুঁতে ফেলার’ হুমকি দিয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. নুরুন্নবী সরকার। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয় এবং জেলাজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
ঘটনাটি ঘটে শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাণীশংকৈল উপজেলার বাচোর ইউনিয়নের বক্সা সুন্দরপুর গ্রামে। অভিযুক্ত পিআইও মো. নুরুন্নবী সরকার কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর এলাকার মৃত খবির উদ্দিন সরকারের ছেলে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বাচোর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. আক্কাশ আলী শনিবার রাতেই রাণীশংকৈল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
ভাইরাল ভিডিওতে পিআইও নুরুন্নবী সরকারকে ইউপি সদস্য আক্কাশ আলীর উদ্দেশে হুমকিমূলক ও অবমাননাকর ভাষায় কথা বলতে শোনা যায়। তিনি বলেন, তোর চেয়ারম্যান পর্যন্ত আব্বা ডাকবে। আইসা আব্বা ডাকবে। পিআইও যে কী জিনিস! আমি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। চেয়ারম্যানসহ একদম গাড়ে (পুঁতে) দিব সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে।
তিনি আরও বলেন, আপনার মেম্বারি খাইতে আমার একটা চিঠিই যথেষ্ট। ঢাকায় পৌঁছাতে যতটা সময় লাগবে, মেম্বারি যেতে ততটাও সময় লাগবে না। প্রমাণ করে দেব। মেম্বারি যাবে, তারপর জেলের ভাত খাওয়াবো।
ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে ইউনিয়নবাসী বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
তবে ইউপি সদস্য আক্কাশ আলী অভিযোগ করে বলেন, আমি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী টিআর ও কাবিখা কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ পাই। বরাদ্দ পাওয়ার পর পিআইও মো. নুরুন্নবী সরকার আমার কাছে এই বরাদ্দের ভিত্তিতে ২০ হাজার টাকা উৎকোচ দাবি করেন। আমি লেনদেনে রাজি না হওয়ায় তিনি আমার ওপর ক্ষিপ্ত হন। তিনি প্রকাশ্যে আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং মারধরের হুমকি দেন। একপর্যায়ে বলেন, আমি তোমার মেম্বারি খেয়ে ফেলবো, তোমাকে মাটিতে পুঁতে ফেলবো।
তিনি আরও বলেন, আমি তখন পিআইওকে বলি, আমার কাজে যদি কোনো অনিয়ম থাকে, তাহলে বিষয়টি আমার ইউপি চেয়ারম্যানকে জানান। কিন্তু এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পিআইও তখন চেয়ারম্যানকে নিয়েও কটূক্তি করেন এবং বলেন, তোমার চেয়ারম্যান তো চোর-বাটপার, সে আমাকে আব্বা বলে ডাকবে।
তিনি বলেন, সরকারি দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার এমন আচরণে আমি ব্যথিত হয়েছি। এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি আমার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছেন। তাই আমি রাতেই থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছি ওনার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, রাণীশংকৈলে যোগদানের পর থেকেই পিআইও নুরুন্নবী সরকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে আসছেন। সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে অফিস কক্ষে ধূমপানসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে এর আগেও তার অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন উপজেলাবাসী। সেই মানববন্ধনের সংবাদ প্রকাশের জেরে স্থানীয় দুই সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম সুজন ও ফারুক আহম্মেদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে থানায় মিথ্যা অভিযোগে চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় এক মাস উপজেলা ডাকবাংলোয় অবস্থান করেন পিআইও নুরুন্নবী সরকার। এতে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ টাকার বিল বকেয়া পড়ে। ওই বকেয়া টাকা চাইতে গেলে ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার মো. বেলাল হোসেনকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেন এবং তার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও চিফ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে অভিযোগ করার ভয় দেখান বলে দাবি করা হয়েছে। পরে বকেয়া ভাড়া আদায় ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ এনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেন কেয়ারটেকার বেলাল হোসেন।
এ ছাড়া, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে কর্মরত থাকাকালেও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে বলে জানা গেছে। এমনকি অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ৬ কোটি টাকার একটি বিলে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম সুজন ও ফারুক আহম্মেদ অভিযোগ করে বলেন, পিআইও মো. নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের মানববন্ধন ও বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ ও প্রকাশ করার জেরেই তিনি আমাদের টার্গেট করেন। সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই তিনি আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ হন। পরবর্তীতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে আমাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগে মামলা করেন। যাতে আমরা হেনস্তার শিকার হই।
তারা আরও বলেন, আমরা কারও কাছ থেকে কখনও চাঁদা দাবি করিনি। আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও হয়রানিমূলক। একজন সরকারি কর্মকর্তা তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে সংবাদকর্মীদের কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ঢাকতেই আমাদের বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়েছে। আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মিথ্যা অভিযোগে করা মামলা প্রত্যাহার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।
তবে অভিযোগ প্রসঙ্গে একাধিকবার পিআইও মো. নুরুন্নবী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঘটনাটি নিয়ে প্রাথমিকভাবে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে এলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
তিনি আরও বলেন, যদি তদন্তে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উৎকোচ দাবি, অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা বেগম বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় তদন্তের ব্যবস্থা করা হবে। তদন্তে সত্যতা মিললে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় রাণীশংকৈল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমানুল্লাহ আল বারি বলেন, এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগটি গ্রহণ করে তা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ ও অভিযোগে উল্লিখিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আপনার মতামত লিখুন : :