ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে কৃষি মালামাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত কৃষকদের কৃষি উপকরণ না দিয়ে ভুয়া তালিকা করে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী কৃষক।
গত বুধবার (১ এপ্রিল) বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতে খরিপ মৌসুমে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে প্রনোদনা কর্মসূচীর মালামাল বিতরণ করা হয়েছে।
কৃষি উপকরণ বিতরণের সময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুন, অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা সাবরিনা শারমিন, উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ অফিসার মো. মানিকুর রহমান প্রমুখ।
উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মোট ৯শত ৫০ কৃষক-কৃষাণীর মাঝে এসময় বিভিন্ন কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ১শত জন কৃষক বিনামূল্যে, জনপ্রতি ১ বিঘা জমিতে তিল চাষের জন্য ১ কেজি তিল বীজ, ১০ কেজি ডিএপি, ৫ কেজি এমওপি সার দেয়া হয়েছে।
১শত ৫০ জন কৃষক বিনামূল্যে, জনপ্রতি ১ বিঘা জমিতে পাট চাষের জন্য ১ কেজি পাট বীজ, ৫ কেজি ডিএপি, ৫ কেজি এমওপি সার পেয়েছেন।
৭শত জন কৃষক বিনামূল্যে, জনপ্রতি ১ বিঘা জমিতে আউশ ধান চাষের জন্য ৫ কেজি আউশ ধান বীজ, ১০ কেজি ডিএপি, ১০ কেজি এমওপি সার বিতরণ করা হয়েছে।
তবে এসব মালামাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মাঠপর্যায়ের অসাধু কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কারণে প্রকৃত কৃষকরা সার, বীজ ও প্রণোদনা পাচ্ছে না। মাঠ কর্মকর্তারা প্রতি বছর ঘুরেফিরে তাদের পছন্দের লোকদের নাম মাত্র তালিকা করে সার-বীজ ও কৃষি প্রণোদনা তুলে তা নিজেরাই অন্য জায়গায় বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে কিছু কৃষি উপসহকারীদের বিরুদ্ধে।

এখানেই শেষ নয়, গত ১৮ বছর যাবত স্থানীয় সাংবাদিকরা কৃষকদের প্রণোদনা তালিকা চাইলে তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় বাঞ্ছারামপুর কৃষি অফিস। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই জায়গায় কর্মরত থাকার কারণে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। ক্ষমতার পালাবদলে তারাও বদলে যান কিন্তু বরাবরই উপেক্ষিত থাকে প্রকৃত কৃষকরা।
উপজেলার কয়েকজন কৃষক অভিযোগে জানান, জমি নেই এমন চাষিরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের নাম তালিকাভুক্ত করে নেন। এরপর বিনা মূল্যে সার-বীজ উত্তোলন করে কম টাকায় ডিলারদের কাছে বিক্রি করে দেন। পরে ডিলারদের কাছ থেকে চড়া দামে তাদের সেগুলো কিনতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী প্রণোদনার সার-বীজ বিতরণে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের প্রকৃত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করার কথা। কিন্তু তারা সরেজমিনে কৃষকদের সঙ্গে কথা না বলে কিংবা মাঠ পর্যায়ে না গিয়ে জনপ্রতিনিধি ও একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা নিয়ে অসৎ উপায়ে তালিকা প্রস্তুত করেন। এতে যাচাই-বাছাই ছাড়াই জমিহীন এমনকি কোনো দিন কৃষিকাজ করেননি এমন কৃষকের নামও তালিকায় স্থান পেয়েছে। ফলে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক কৃষক জানায়, আমার পূর্ব পুরুষরাও কৃষি কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। আমরাই গ্রামের প্রকৃত কৃষক, কিন্তু আমাদের কৃষিকার্ড দেয়া হয়নি। বিনা মূল্যে পাওয়া তো দূরের কথা, ডিলারদের কাছ থেকে চড়া মূল্যে সার ও বীজ কিনে কাজ করি। কখনও সরকারের প্রণোদনা পাইনি।
তবে কৃষক আবদুল মোমেন, জহর আলী, ফজলু মিয়াসহ কয়েকজন কৃষক জানান, তারা ১৮ কাঠা থেকে ৬০ কাঠা পর্যন্ত জমিতে চাষাবাদ করেছেন। কিন্তু কেউ কৃষিকার্ড পায়নি। কখন কার্ড দেয়া হয়েছে তাও জানেন না।
তাদের অভিযোগ, উপজেলার বেশির ভাগ প্রকৃত কৃষকদের এ সরকারি সুবিধার আওতায় আনা হয়নি। খোঁজখবর না নিয়েই যাদের জমি খুব কম, কিংবা নেই, জমি থাকলেও চাষ করেন না এমন ব্যক্তির নাম তালিকায় রাখা হয়েছে।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলার প্রকৃত কৃষকরা সরকারের উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আপনার মতামত লিখুন : :