হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির দায়ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া নির্বাহী প্রকৌশলীর ব্যাংক হিসাবে মিলল না বড় অঙ্কের কোনও টাকা। পাওয়া গেল না তার নামে বড় কোনো সম্পদের খোঁজও। কাগজে-কলমে প্রায় নিঃস্ব সরকারি বড় কর্মকর্তা। অথচ, কোনও চাকরি বা ব্যবসা না করেও তার গৃহিণী স্ত্রী ঢাকায় তিন ফ্ল্যাটসহ কোটি কোটি টাকার জমি ও বিল্ডিংয়ের মালিক। সেইসঙ্গে কোটিপতি কলেজপড়ুয়া দুই ছেলে।
এই অবস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পিরোজপুরের সাময়িক বরখাস্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার হাওলাদারের।
পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দীন মহারাজের পরিবারের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনেক দিন ধরেই আলোচনায়। এলজিইডি পিরোজপুরের বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মহারাজ পরিবার এই অর্থ আত্মসাত করেছিল।
এই দুর্নীতির নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন এলজিইডির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার হাওলাদার। অনুসন্ধান শেষে মামলা দায়েরের পর এমনটাই বলছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মহারাজের পরিবারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আটটি মামলায়ও আসামি তিনি। তবে, অনুসন্ধানে নেমে প্রথমে খানিকটা বিস্মিতই হন দুদকের কর্মকর্তারা। কারণ, প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের নিজের নামে উল্লেখযোগ্য কোনো অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু, পরিবারের সদস্যদের সম্পদের খোঁজ করতে গিয়েই তার স্ত্রী ও দুই ছেলের নামে মিলেছে কোটি কোটি টাকার সম্পদের হিসাব।
দুদকের অভিযোগ, এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ভুয়া কাজ দেখানো এবং ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেই অর্থের উৎস আড়াল করতে পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ গড়ে তোলা হয়।
বুধবার (১১ মার্চ) বিকেলে পিরোজপুরে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এ ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করেছেন সংস্থাটির উপসহকারী পরিচালক পার্থ চন্দ্র পাল। মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার হাওলাদার, তাঁর স্ত্রী রীনা পারভীন এবং দুই ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাত ও ফজলে রাব্বি রিমনকে।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী রীনা পারভীন একজন গৃহিণী। তার নিজস্ব কোনো পেশা বা আয়ের উৎস নেই। তবু তার নামেই পাওয়া গেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার সম্পদের হিসাব।
পটুয়াখালী পৌরসভার আরামবাগ এলাকায় প্রায় ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে তার নামে নির্মিত হয়েছে একটি তিনতলা ভবন। ঢাকার পান্থপথে ফেয়ার দিয়া কমপ্লেক্সে প্রায় ৪৭ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে এক হাজার ৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট। এর বাইরে পশ্চিম আগারগাঁওয়ের আবেদীন ড্রিমস প্রকল্পে দুটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য প্রায় দুই কোটি ৬৬ লাখ টাকা বিনিয়োগের তথ্যও পেয়েছে দুদক। সব মিলিয়ে জমি, ফ্ল্যাট ও ভবনসহ প্রায় চার কোটি ৩৮ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে তার নামে। এর বাইরে ব্যাংক সঞ্চয়, গাড়ি ক্রয় ও ব্যবসার মূলধন মিলিয়ে আরও প্রায় এক কোটি ৯ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদের হিসাব মিলেছে রীনা পারভীনের নামে।
দুদকের হিসাব অনুযায়ী, রীনা পারভীনের গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস মাত্র ২০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ফলে প্রায় পাঁচ কোটি ৩৪ লাখ টাকার সম্পদ তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কলেজছাত্র হয়েও কোটিপতি দুই ছেলে
স্ত্রীকেই শুধু সম্পদশালী বানাননি নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার হাওলাদার; কোটি টাকার মালিক বানিয়েছেন দুই ছেলেকেও। মামলার নথি বলছে, মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাত ও ফজলে রাব্বি রিমন সম্পদ অর্জনের সময় দুজনই ছাত্র ছিলেন। তাদের কোনো পেশা বা নিজস্ব আয় নেই। তবু তাদের নামে রয়েছে কোটি টাকার সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেন।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বড় ছেলে রিফাতের নামে প্রায় ১২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা এবং ছোট ছেলে রিমনের নামে প্রায় ১২ লাখ ৩৮ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রিফাতের নামে প্রায় ৯৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা এবং রিমনের নামে প্রায় ৭৩ লাখ ৫১ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। সব মিলিয়ে দুই ছেলের নামে প্রায় দুই কোটি ৭১ লাখ টাকার সম্পদের হিসাব উঠে এসেছে।
দুদকের অভিযোগ, অবৈধ অর্থের উৎস আড়াল করতে বড় ছেলে রিফাতের নামে প্রায় এক কোটি ১১ লাখ টাকা এবং ছোট ছেলে রিমনের নামে প্রায় ৮৫ লাখ টাকার সম্পদ দেখানো হয়েছে। এমনকি তাদের নামে আয়কর নথিও খোলা হয়েছে, যদিও বাস্তবে কোনো আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি।
দুদকের আবেদনের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে আসামিদের নামে অর্জিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক এবং ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার নির্দেশ দিয়েছেন পিরোজপুরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ স্পেশাল জজ আদালত।
দুদকের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এখনো নিয়োগ করা হয়নি। সেই প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত শুরু হলে আরও সম্পদের তথ্য সামনে আসতে পারে বলেও মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
আপনার মতামত লিখুন : :